Menu

Quarterly Report

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি জানুয়ারি-মার্চ, ২০২৬

Ref: hrss/2026/ga/15                                                                  ১১ এপ্রিল, ২০২৬

প্রেস বিজ্ঞপ্তি

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি জানুয়ারি-মার্চ, ২০২৬

‘এইচআরএসএস’ এর ত্রৈমাসিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন

২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়কালটি বাংলাদেশের জন্য একদিকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক রূপান্তরের সূচক, অন্যদিকে মানবাধিকার পরিস্থিতির ক্ষেত্রে গভীর উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের পর যে গণতান্ত্রিক প্রত্যাশা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অঙ্গীকার তৈরি হয়েছিল, এই ত্রৈমাসিকে তার বাস্তবায়ন নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং পরবর্তীতে ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি করলেও নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেশজুড়ে সহিংসতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের বহু ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনায় বহু মানুষ নিহত ও আহত হন, যা সাধারণ নাগরিকের জানমাল নিরাপত্তা এবং আইনের শাসনের প্রতি আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে।

উক্ত সময়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতা পরিলক্ষিত হয়েছে। সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হয়রানির পাশাপাশি দণ্ডবিধির ৫৪ ধারা এবং সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ এর অপব্যবহারের অভিযোগ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনাও এই সময়ে উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। নির্বাচনী সহিংসতার পাশাপাশি নারী প্রার্থী ও রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর শারীরিক, মানসিক ও অনলাইন হয়রানি, ধর্ষণ ও লাঞ্ছনার অভিযোগ সামনে এসেছে, যা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণকে গুরুতরভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। একই সঙ্গে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে ভাঙচুর এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাও বিভিন্ন স্থানে লক্ষ্য করা গেছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি বিচারহীনতার সংস্কৃতি, গণপিটুনি, কারাগারে মৃত্যুর ঘটনা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারীকৃত ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অধ্যাদেশ সংসদে অনুমোদন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নতুন সরকারের মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার রক্ষার প্রতিশ্রুতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিশেষত গণভোট আদেশ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, স্বতন্ত্র সচিবালয় অধ্যাদেশ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ বাতিলের সিদ্ধান্ত বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার সুরক্ষার অঙ্গীকার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটেও পরিস্থিতি ছিল চ্যালেঞ্জপূর্ণ। পবিত্র রমজান মাসে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ঘাটতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। পবিত্র ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে সড়ক ও নৌপথে দুর্ঘটনায় সাড়ে তিন শতাধিক মানুষের মৃত্যু দেশের জননিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।

এছাড়া সারাদেশে হামের প্রাদুর্ভাবে শতাধিক শিশুর মৃত্যু জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতিকে সামনে নিয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের প্রভাবে কমপক্ষে ৬ জন প্রবাসী বাংলাদেশির প্রাণহানি এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা জনমনে অতিরিক্ত উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। একই সময়ে মার্চ মাসে তেলপাম্পে তেল নেওয়াকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংসতায় হতাহতের ঘটনাও পরিস্থিতির নাজুকতাকে নির্দেশ করে, যেখানে বাজার তদারকির দুর্বলতা ও সরবরাহ সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

বাংলাদেশের ১৬ টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এর সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ এই ত্রৈমাসিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে নিন্মোক্ত তথ্য উঠে এসেছে:

রাজনৈতিক সহিংসতা

গত তিন মাসে কমপক্ষে ৬১০ টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৩৬ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৪০৭৮ জন। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতা, বিভিন্ন দলের সমাবেশ কেন্দ্রিক সহিংসতা, প্রার্থীর সমর্থকের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা, বাড়ি-ঘর, যানবাহন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ও রাজনৈতিক দলের কার্যালয় ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর পৃথক হামলা, গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা এবং দেশব্যাপী ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

গত তিন মাসে সহিংসতার ৬১০ টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ১৯৪ টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৫৮৫ জন ও নিহত ২৪ জন। ২৬০ টি বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৬৫৪ জন ও নিহত ০৭ জন, ৩৬ টি বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ২১৯ জন এবং নিহত হয়েছেন ০৩ জন। ২৩ টি বিএনপি-এনসিপি মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ২০৪ জন, আওয়ামীলীগ-এনসিপির মধ্যে ৩টি সংঘর্ষের ঘটনায় আহত ৫১ জন, ৬০ টি বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৬৯ জন। এছাড়া, বিভিন্ন দলের মধ্যে ৩৪ টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ১৯৬ জন এবং নিহত হয়েছেন ০২ জন। ৬১০ টি সহিংসতার ঘটনার ৫৭৩ টিই (৯৪%) ঘটেছে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ও বিএনপির সাথে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে। নিহত ৩৬ জনের মধ্যে বিএনপির ২৮ (৭৮%) জন, জামায়াতের ০৪ (১১%) জন ও আওয়ামীলীগের ১ জন এবং অন্যান্য ০৩ জন।

ক্রম

রাজনৈতিক দলসমূহ

সংঘর্ষের ঘটনা

আহত

নিহত

বিএনপি- বিএনপি

১৯৪

১৫৮৫

২৪

বিএনপি-জামায়াতের

২৬০

১৬৫৪

০৭

বিএনপি-আওয়ামী লীগ

৩৬

২১৯

০৩

বিএনপি-এনসিপি

২৩

২০৪

-

আওয়ামীলীগ-এনসিপি

০৩

৫১

-

বিএনপি-অন্যান্য দল

৬০

১৬৯

-

অন্যান্য দলের মধ্যে

৩৪

১৯৬

মোট

৬১০

৪০৭৮

৩৬

এর পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ৩৪ টি ঘটনা ঘটেছে। এসকল হামলায় কমপক্ষে ২৯ জন আহত এবং বিএনপির ১২ জন, আওয়ামীলীগের ৪ জন, জামায়াতের ৩ জন ও অন্যান্য দলের ৩ জনসহ মোট ২২ জন নিহত হয়েছেন। এ সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় অর্ধশতাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এছাড়াও সারাদেশে আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, নির্বাচনী সহিংসতা, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রীক সাত শতাধিক বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠা, দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। 

গত জানুয়ারি-মার্চ, এই তিন মাসে দেশের রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্র বিশ্লেষণ করলে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। জানুয়ারি মাসে মোট ১৫১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৮ জন নিহত এবং ১২৩৩ জন আহত হন, যা তুলনামূলকভাবে কম হলেও রাজনৈতিক উত্তেজনার একটি সূচনা পর্যায় নির্দেশ করে। তবে ফেব্রুয়ারি মাসে এই সহিংসতা হঠাৎ করেই ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়; এ মাসে ৩৪৬টি ঘটনায় অন্তত ১০ জন নিহত এবং ১৯৩৩ জন আহত হন। অন্যদিকে মার্চ মাসে সহিংসতার মোট সংখ্যা কমে ১১৩ টিতে দাঁড়ালেও নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৮ জনে পৌঁছায় এবং আহত হন ৯১২ জন। এটি নির্দেশ করে যে সহিংসতার প্রকৃতি আরও তীব্র ও প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। এ সময় নির্বাচন-পরবর্তী প্রতিশোধমূলক সংঘর্ষ, আধিপত্য বিস্তার এবং রাজনৈতিক বিরোধ সহিংসতার প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

এই সামগ্রিক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক পরিস্থিতির অস্থিরতা আরও তীব্র হয়েছে। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, যার ফলে দলটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। তবে নির্বাচন শেষ হওয়ার পরপরই ঢাকাসহ অন্তত ৩০টি জেলা ও উপজেলায় দলটির নেতাকর্মীরা দলীয় কার্যালয়ে পুনরায় প্রবেশের চেষ্টা করছেন বা কোথাও কোথাও অবস্থান নিয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমে জানা গেছে। এর ফলে বিভিন্ন স্থানে কার্যালয় পুনর্দখলকে কেন্দ্র করে পাল্টা দখল, হামলা, ভাঙচুর ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও অস্থিতিশীল করে তুলছে।

নির্বাচনী সহিংসতা

২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়কালে সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সহিংসতা, সংঘর্ষ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা উদ্বেগজনক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলসমূহের মনোনীত প্রার্থী, বিদ্রোহী (বঞ্চিত) প্রার্থী এবং তাদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা গেছে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

বিশেষ করে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিজয়ী প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের দ্বারা পরাজিত প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের বাড়িঘর, যানবাহন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ব্যাপকভাবে ঘটেছে। এই প্রতিহিংসামূলক সহিংসতা স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, যা আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য গভীর হুমকি হিসেবে বিবেচিত।

উল্লেখিত তিন মাসে নির্বাচনকেন্দ্রিক অন্তত ৩৯৫টি সহিংসতার ঘটনায় কমপক্ষে ২,৫৭৩ জন আহত হয়েছেন এবং নিহত হয়েছেন ১২ জন। এছাড়া নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ৬০০ টিরও বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।

সহিংসতার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং পারস্পরিক সংঘর্ষ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ১১৯টি ঘটনায় অন্তত ৯০৫ জন আহত এবং ৮ জন নিহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে ২৩১টি ঘটনায় অন্তত ১,৪২৪ জন আহত এবং ৩ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষে ৩টি ঘটনায় ৩ জন আহত ও ১ জন নিহত হয়েছেন। বিএনপি-এনসিপি সংঘর্ষে ১৬টি ঘটনায় ১৪১ জন আহত হয়েছেন এবং বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে ১৭টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৬৩ জন। অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘটিত ১০টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩৮ জন।

নিহতদের রাজনৈতিক পরিচয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ১২ জন নিহতের মধ্যে বিএনপির ৮ জন, আওয়ামী লীগের ১ জন, জামায়াতের ২ জন এবং রাজনৈতিক পরিচয় অজানা ১ জনের। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে ৫ জন নিহত হয়েছেন, যা দলীয় কোন্দলের তীব্রতা নির্দেশ করে।

সহিংসতার পৃথক ঘটনাগুলোর মধ্যে কয়েকটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গত ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার এরশাদ বাজারে স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর রুবেলের নির্বাচনী অফিস উদ্বোধন অনুষ্ঠানে দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে নজরুল নিহত হন। গত ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদের সংঘর্ষে আহত মাওলানা রেজাউল করিম পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ফেব্রুয়ারি মাসে সহিংসতার মাত্রা আরও বৃদ্ধি পায়। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি, মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার চরাঞ্চলে বিএনপির সমর্থক জসিম উদ্দিন (৩০) নিহত হন। ১৪ ফেব্রুয়ারি, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে বিএনপি কর্মীর ছেলে ইমন (১২) নিহত হয়, যা শিশুদের ওপর সহিংসতার ঝুঁকি তুলে ধরে। একই দিনে বাগেরহাটের কচুয়ায় বিএনপির সমর্থক ওসমান সর্দার (২৯) নিহত হন। ১৫ ফেব্রুয়ারি, ভোলার চরফ্যাশনে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় আওয়ামী লীগের সমর্থক আব্দুর রহিম (৪৫) কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এছাড়া

মার্চ মাসেও সহিংসতা অব্যাহত থাকে। গত ৫ মার্চ ২০২৬, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে মো. রুবেল মিয়া ও মো. সোহেল মিয়া নিহত হন। এছাড়া ১৮ মার্চ ২০২৬, পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় নীলগঞ্জ ইউনিয়নে মো. ইদ্রিস (৪৫) নামে এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে মারধর করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে, যা নির্বাচনী প্রতিহিংসার আরেকটি দৃষ্টান্ত।

নির্বাচনী সহিংসতা শুধু প্রাণহানি ও সম্পদ ধ্বংসেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; নারী নির্যাতনের ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে সামনে এসেছে। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি, নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার চানন্দী ইউনিয়নে ‘শাপলা কলি’ প্রতীকে ভোট দেওয়াকে কেন্দ্র করে তিন সন্তানের জননী এক নারীকে নিজ ঘরে ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। হামলাকারীরা ঘরে ভাঙচুর চালিয়ে তাকে টেনে বের করে মারধর করে এবং ভোট দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে অপমানজনক মন্তব্য করে।

এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও প্রচার-প্রচারণায় নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এর পাশাপাশি নারী সহিংসতা, হেনস্থা ও লাঞ্ছনার ঘটনাও বেড়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত ৩ মাসে অন্তত ১২টি ঘটনায় কমপক্ষে ১৮ জন নারী হেনস্তার শিকার হয়েছেন এবং ৬ জন নারী আহত হয়েছেন। হেনস্তার শিকারদের মধ্যে ১৭ জন জামায়াত সমর্থক এবং ১ জন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সমর্থক নারী রয়েছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ১২টি ঘটনার মধ্যে ১১টিতে বিএনপি ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের এবং ১টিতে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।

সভা-সমাবেশে বাঁধা

গত তিন মাসে মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপের বেশ কিছু ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উক্ত সময়ে অন্তত ১৭টি সভা ও সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা প্রদান করে, যার ফলে নির্ধারিত কর্মসূচি স্থগিত, ছত্রভঙ্গ অথবা বাতিল করতে বাধ্য হন আয়োজকরা। এই ধরনের হস্তক্ষেপের ফলে সংঘর্ষ ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং অন্তত ২০৪ জন ব্যক্তি আহত হন, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ পথচারীও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানী

এটি উদ্বেগজনক যে, এই সময়ে অন্তত ৮২ টি হামলার ঘটনায় কমপক্ষে ১৮৩ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সকল ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্ততপক্ষে ১২২ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ২০ জন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ২১ জন সাংবাদিক। ২ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। এছাড়া সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ-২০২৫ এর অধীনে ৮ জন সাংবাদিককে আসামী করে দুইটি মামলা হয়েছে।

গত ১১ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে স্থানীয় অপরাধ ও ভূমিদস্যু সংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে দৈনিক মানবকণ্ঠ পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার রাশেদুল ইসলাম ও এশিয়ান টেলিভিশনের সাংবাদিক নাজমুল হাসানকে লোহার পাইপ দিয়ে পিটিয়ে আহত করার অভিযোগ উঠে। ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংবাদ সংগ্রহের সময় নোয়াখালীর হাতিয়ায় ভোট কেন্দ্রে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসীদের হামলায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে বিটিভির সাংবাদিক মিরাজ উদ্দিনকে কুপিয়ে আহত করা হয়। তাঁর সঙ্গে থাকা বাইক চালক সাকিবও আহত হন। এছাড়া গত ১৯ ফেব্রুয়ারি এখন টিভির চার সাংবাদিককে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে মতামত প্রকাশের জেরে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান এবং সাত দিনের জন্য কর্মবিরতিতে যেতে বাধ্য করার ঘটনা ঘটেছে।

মত প্রকাশের স্বাধীনতা

এই সময়ে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫-এর বিভিন্ন ধারার অধীনে পৃথক ৭টি মামলায় ৩৪ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে ৪ জনকে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দেওয়ায় ২ জনকে আটক করা হয়েছে। অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যাক্তির সমালোচনায় নিহত ১ জন, আহত ১ জন, আটক  ১ জন ও ৪টি মামলা হয়েছে। এছাড়া ৫ জনকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও কুরআন অবমাননার অভিযোগে আটক করা হয়েছে, এসব ঘটনায় ২টি মামলা দায়ের ও ১জন আহত হয়েছে।  গত ৩ মার্চ পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ফেসবুকে বিএনপি নেতা জহিরুল ইসলামের বিরূদ্ধে সমালোচনামূলক পোস্ট দেওয়ায় মো. ইদ্রিস (৪৫) নামে একজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ৪ ফেব্রুয়াবি জামায়াতে আমীর ডা. শফিকুর রহমানের এক্স অ্যাকাউন্ট ‘হ্যাকের’ অভিযোগে বঙ্গভবনের সহকারী প্রোগ্রামার ছরওয়ার আলমকে আটক করে পুলিশ। এসময় হাতিরঝিল থানায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ আইনে একটি মামলা করা হয়।

মব সহিংসতা ও গণপিটুনী

গত তিন মাসে গণপিটুনী ও মব সহিংসতার কমপক্ষে ৮৮ টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৪৯ জন এবং আহত হয়েছেন ৮০ জন।

গত ৭ জানুয়ারি মাগুরা সদর উপজেলার ইছাখাদা বাজারে গরুচোর সন্দেহে স্থানীয় লোকজনের গণপিটুনিতে মো. আকিদুল (৪০) নামে এক ব্যাক্তি নিহত হন। অপরদিকে গত ১৩ জানুয়ারি পাবনার সুজানগর উপজেলার তাঁতিবন্ধ রেলস্টেশন এলাকায় গরুচোর সন্দেহে সাগর শেখ (২৫) নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। গত ২০ ফেব্রুয়ারি গাইবান্ধার সাদুল্লাহপুরের ইদিলপুর ইউনিয়নের মোজাহি পুর গ্রামে ছিনতাইকারী সন্দেহে লেবু মিয়া ওরফে ভন্ডল (২৪) ও মঈনুল ইসলাম (৫০) স্থানীয়দের গণপিটুনিতে দুইজন নিহত হয়েছেন। ৪ মার্চ সাতঘরিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের বিদ্যুতের তার চুরি করে পালানোর সময় মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মো. সাগর (৩২) ও সানারুল (৩৪) নামের দুই যুবককে চুরির অভিযোগে গাছে বেঁধে রাত থেকে সকাল পর্যন্ত গাছের সঙ্গে বেঁধে দফায় দফায় পিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়।

ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন

এটি উদ্বেগজনক যে, এই সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর কমপক্ষে ২৭ টি হামলার ঘটনায় ৩১ জন আহত হয়েছেন, এবং ৪ টি মন্দির, ২ টি প্রতিমা ও ১৯ টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে । এছাড়াও জমি দখলের ৩ টি ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির ১০টি ঘটনা ঘটেছে।

গত ৮ মার্চ শনিপুজা চলাকালে কুমিল্লা নগরীর দক্ষিণ ঠাকুরপাড়া (বাগানবাড়ি) এলাকার কালী গাছতলা শিব মন্দিরসহ আশপাশের এলাকায় ককটেল বিষ্ফোরণে পুরোহিত কেশব চক্রবর্তীসহ ৪ জন আহত হন। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে নারায়ণগঞ্জের রুপগঞ্জের গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের সাওঘাট পশ্চিম মনিপাড়া এলাকায় অবস্থিত শ্রীশ্রী রক্ষাকালী মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসময় ৮-১০ জন দূর্বৃত্ত লোহার পাইপ, লাঠিসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করে সরস্বতী প্রতিমা, চেয়ার, রান্নার পাতিল, বৈদ্যুতিক তার ও লাইটসহ বিভিন্ন সামগ্রী ভাঙচুর করে। এমনকি কেরোসিন বা মবিল জাতীয় দাহ্য পদার্থ ঢেলে মন্দিরে অগ্নিসংযোগ করা হয়।

সীমান্তে হত্যা ও নির্যাতন

গত তিন মাসে মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ১৩ টি হামলার ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ)  হামলায় নিহত ১, আহত হয়েছেন ১১ জন, এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত ৪ জন । এছাড়া ১৫ জনকে বিভিন্ন সীমান্ত থেকে আটক করা হয়েছে। গত ৪ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলার ১৯/৭ এস এলাকায় গরু আনতে গেলে রবিউল ইসলাম(৩৫) নামে এক যুবককে আটক করে বিএসএফের পাতলা টোলা সাব-ক্যাম্পের সদস্যরা। পরে তাকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে বলে জানা যায়। এসময় তার সঙ্গে থাকা মানারুল (৪০) ও রমজান আলী (৩৫) নামের দুই যুবক পালিয়ে আসেন এবং রবিউলকে আটকের বিষয়টি গণমাধ্যমে জানান তারা।

অপরদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ১১টি সহিংসতার ঘটনায় ৫ জন আহত, গুলিবিদ্ধ ৪ জন এবং ৩২ জনকে আটক করা হয়েছে। গত ৮ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজারের টেকনাফে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে মিয়ানমারের দিক থেকে আরাকান আর্মির ছোড়া গুলিতে গুরুতর আহত শিশু হুজাইফা আফনান (৯) ২৭দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। এর আগে গত ১১ জানুয়ারি সকালে টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় মিয়ানমারের ওপার থেকে আসা গুলি মাথায় বিদ্ধ হয়ে আহত হয় স্থানীয় বাসিন্দা জসিম উদ্দিনের মেয়ে হুজাইফা আফনান। গত ০৬ মার্চ বান্দরবানের সীমান্তবর্তী নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে পুতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে আবদুল জব্বার (৫৩) নামে এক ব্যক্তি গুরুতর আহত হন। বিস্ফোরণে তার একটি পা উড়ে যায়।

 

বিচার বহির্ভূত হত্যা (হেফাজতে/নির্যাতনে/গুলি/বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যু)

দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, ভিকটিমের পরিবার ও এইচআরএসএস এর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজত, নির্যাতন, গুলিবর্ষণ এবং কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’-এর ঘটনায় অন্তত ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হেফাজতে ও নির্যাতনের শিকার হয়ে ৫ জন, গুলিবিদ্ধ হয়ে ১ জন এবং বন্দুকযুদ্ধে ১ জন নিহত হয়েছেন।

উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে-গত ১২ জানুয়ারি ২০২৬, চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হেফাজতে নির্যাতনের শিকার হয়ে পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান ডাবলু (৪৫) নিহত হন। এরপর ২২ জানুয়ারি ২০২৬, রংপুর নগরীতে পুলিশ হেফাজতে মুকুল মিয়া (৪৫) নামে এক ট্রাকচালকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে স্থানীয় বাসিন্দারা রাত দেড়টার দিকে তার লাশ শহীদ মুখতার এলাহী চত্বরে রেখে ঢাকা-দিনাজপুর মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন, যা জনমনে ক্ষোভ ও অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।

গত ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলায় সেনাবাহিনীর হেফাজতে রাসেল কাজী (৩৫) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, তাকে শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বান্দরবানের বোয়াংছড়ি উপজেলার মুরুং বাজার এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে পাহাড়ি সশস্ত্র সংগঠন জেএসএস-এর গোলাগুলির ঘটনায় সংগঠনটির এক সদস্য নিহত হন, যা ‘বন্দুকযুদ্ধ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সর্বশেষ, ৫ মার্চ ২০২৬, নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলায় পুলিশের একটি অভিযানের সময় আব্দুল হামিদ ধলা (৬৬) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। পরিবারের দাবি, পুলিশের লাথির আঘাতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং পরবর্তীতে মারা যান।

কারা হেফাজতে মৃত্যু

চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে সারাদেশে কারাগারে কমপক্ষে ৩৯ জন আসামী মারা গিয়েছেন। ৩৯ জনের মধ্যে ১৬ জন কয়েদী ও ২৩ জন হাজতি। এর মধ্যে ১২ জন আওয়ামীলীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের এবং ২৭ জন সাধারণ কয়েদী।

গত ১২ জানুয়ারি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পাবনা জেলার সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক ও সংগীতশিল্পী প্রলয় চাকী (৬০) কারা হেফাজতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। পরিবারের দাবি, তিনি হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন। কারাগারে যথাযথ চিকিৎসার অভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। গত ৭ ফেব্রুয়ারি সকালে কারাবরণ অবস্থায় অসুস্থ হয়ে পড়লে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন নেওয়া হয়, সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। তিনি ২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট আটকের পর থেকে ৩টি মামলায় দিনাজপুর জেলা কারাগারে বন্দি ছিলেন। গত ১৫ মার্চ সকালে কারাবরণ অবস্থায় অসুস্থ হয়ে রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার হাটশেরপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শাহনূর আলম (৬০)।  

শ্রমিক নির্যাতন

গত তিন মাসে ১৩৯ টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩০ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৫৭৩ জন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় ৭২ জন শ্রমিক তাদের কর্মক্ষেত্রে মারা গেছেন। এছাড়া ২ জন গৃহপরিচালিকা নিহত ও ১ জন আহত হয়েছে।

গত ১৬ ফেব্রুয়ারি রাজবাড়ী জেলা সদরের গোয়ালন্দ মোড় এলাকায় করিম ফিলিং স্টেশনে তেল নিয়ে টাকা না দিলে বাকবিতন্ডার জেরে  ঠিকাদার আবুল হাসেম সুজনের গাড়ি চাপায় রিপন সাহা নামে পাম্প শ্রমিক নিহত হন। এছাড়া, গত ৮ মার্চ রাজধানীর বনানীতে একটি বহুতল ভবনের তিনতলা থেকে পড়ে পিংকী (১৫) নামে এক গৃহকর্মীর রহস্যজনক মৃত্যু হয়। অভিযোগ রয়েছে, তাকে নির্যাতনের পর ফেলে দেওয়া হয়েছে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় বিজিবি সদর দপ্তরের অফিসার্স কোয়ার্টারের একটি বাসা থেকে বিবি হালিমা নামের ১১ বছর বয়সী এক শিশু গৃহকর্মীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

নারী ও শিশু নির্যাতন

গত তিন মাসে কমপক্ষে ৬৭০ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অন্তত ১৪৭ জন, যাদের মধ্যে ৭৬ জন (৫২%) ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, ৩৯ জন (২৭%) নারী ও কন্যা শিশু গণধর্ষনের শিকার হয়েছেন এবং ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়েছে ৯ জনকে। ধর্ষিত হয়ে আত্মহত্যা করেছেন ১ জন। ১৮০ জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন তন্মধ্যে শিশু ৪২ (২৩%) জন। এছাড়া, যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত ৪, আহত হয়েছেন ৮ জন নারী। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ১৩৬ জন, আহত হয়েছেন ৯৬ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ৩০ জন নারী। এছাড়া এসিড সহিংসতায় আহত হয়েছেন এক নারী।

অন্যদিকে, এটি উদ্বেগজনক যে, ৩২৮ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যাদের মধ্যে ১৩৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১৯০ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

গত ৪ জানুয়ারি পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলায় বাবার অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ততা দেখে ফেলায় পারিবারিক কলহ ও মানসম্মানের ভয়ে পঞ্চম শ্রেণী পড়ুয়া স্কুলছাত্রী আয়েশা মনিকে (১১) বাবার নির্দেশে হত্যা করে রান্নাঘরের পাশে বস্তাবন্দী করে করে রাখা হয়। যা আসামী রুবেল প্যাদা (৩৫) শিকার করেন। আসামি আদালতে স্বীকার করেন, শিশুটির বাবা বাবুল প্যাদার (৪৮) নির্দেশে তিনি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। এমনকি মেয়ে নিখোঁজের নাটক সাজিয়ে থানায় জিডি করেন বাবা। গত ৮ জানুয়ারি জামালপুর সদর উপজেলার মেষ্টা ইউনিয়নে এক গৃহবধূ গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। স্ত্রীর সম্ভ্রম রক্ষায় এগিয়ে গেলে স্বামীকে প্রচণ্ড শীতের রাতে ভুট্টাক্ষেতে বেঁধে রাখা হয়। পরে স্বামীর সামনেই স্ত্রীকে ধর্ষণ করে উল্লাস প্রকাশ করে অভিযুক্তরা। গত ১৫ জানুয়ারি খুলনা মহানগরীতে যৌতুকের পাঁচ লাখ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় দুই সন্তানের জননী এক গৃহবধূকে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এমনকি নির্যাতনের এক পর্যায়ে ঐ ভুক্তভোগী গৃহবধূর মাথার চুল কেটে দেওয়া হয়।

২৮ ফেব্রুয়ারি পাবনার ঈশ্বরদীতে মধ্যরাতে বাড়িতে ঢুকে দাদি সুফিয়া বেগমকে হত্যা করে কিশোরী  নাতনি জমিলা আক্তারকে (১৫) গনধর্ষন করে হত্যা করার ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের ধারণা, কিশোরীকে অপহরণে বাধা দেওয়ায় প্রথমে দাদিকে এবং ধর্ষণের পর নাতনিকে হত্যা করা হয়েছে। গত ২ মার্চ চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে ইকোপার্কের নির্জন এলাকা থেকে জান্নাতুল নিশা ইরা (৭) নামে এক শিশুকে ধর্ষনের পর গলা কেটে হত্যার চেষ্টা করা হয়। ঘটনার পরের দিন  চিকিৎসাধীন অবস্থায়  শিশুটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করে। গত ১৪ মার্চ চুয়াডাঙ্গা দামুড়হুদায় দলিয়াপুর জোবেদা খাতুন (৪৫) নামে এক বিধবা নারীকে গণধর্ষণের পর কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ৩০ মার্চ ময়মনসিংহের ফুলপুরে ধর্ষনের অভিযোগ ওঠার পর এক কিশোরীর (১৩) বিষপানে আত্নহত্যার ঘটনা ঘটেছে। ২২ মার্চ নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে যৌতুক না পেয়ে গৃহবধূ অনিকা খাতুন ওরফে ফারহানা (২৪) তার স্বামী মো: সাগর কতৃক নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়।

 

মামলা ও গ্রেফতার

এইসময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মী এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ধারায় কমপক্ষে ৭৬ টি মামলা হয়েছে। এ সকল মামলায় ১৮৫০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ২১০৭৪ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামী করা হয়েছে। এ মাসে রাজনৈতিক মামলায় কমপক্ষে ৮৫৮ আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যেখানে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মী অন্তত ৪৩৬ জন,  বিএনপির নেতাকর্মী ৩১৪ জন এবং জামায়াতের ৭৬ জন, এনসিপি ১৭ জন। এছাড়া এই সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সারাদেশে যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়। এসব অভিযানে প্রায় ৬ সহস্রাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মী।

সার্বিকভাবে মানবাধিকার পরিস্থিতি, ন্যায়বিচার, মানুষের সমান অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বাধীনভাবে বিচারক নিয়োগ, স্বাধীন বিচার সচিবালয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই গণভোট আদেশ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, স্বতন্ত্র সচিবালয় অধ্যাদেশ, দুদক নিয়োগ অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশসহ অম্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারীকৃত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশসমূহ চলতি জাতীয় সংসদ অধিবেশনে বাতিল করা হয়েছে যা পাশ করা জরুরী ছিল।

একইসাথে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি, যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দৃঢ় হয় এবং মানুষের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচনী সহিংসতা, মব সহিংসতা, রাজনৈতিক উত্তেজনা, এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ-এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। তাই “এইচআরএসএস” সরকারের প্রতি মানবাধিকার রক্ষায় আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছে এবং একই সাথে সকল নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ  ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতি অধিক সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানাচ্ছে।

ধন্যবাদসহ

 

ইজাজুল ইসলাম

নির্বাহী পরিচালক

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)

 

No Data Found!