Menu

Monthly Report

Monthly Human Rights Situation Report August 2026

মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি (আগস্ট-২০২৬)

 

২০২৬ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি রাজনৈতিক, সামাজিক, আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা সংক্রান্ত বিভিন্ন ঘটনায় বহুমাত্রিকভাবে আলোচিত হয়েছে। এই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা ও দলীয় অন্তর্কোন্দল, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, সভা-সমাবেশে বাধা, মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হয়রানি, মব সহিংসতা, সীমান্তে হতাহত, কারাগারে মৃত্যু, শ্রম অধিকার লঙ্ঘন এবং নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মতো ঘটনাগুলো বিশেষভাবে উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যৌথবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান, ব্যাপক গ্রেপ্তার ও মামলা দায়েরের ঘটনাও নাগরিক স্বাধীনতা, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে।

 

রাজনৈতিক পরিসরে বিভিন্ন দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ, আন্তঃদলীয় সংঘর্ষ, স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি, সভা-সমাবেশ ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে বাধা এবং কর্মসূচি পণ্ড করে দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এসব ঘটনা নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ, সংগঠন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের অধিকার এবং সামগ্রিক গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক সহিংসতা প্রতিরোধের পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অধিকার নিশ্চিত করা এবং সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।

 

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও রাজনৈতিক বিরোধ, কর্মসূচি পালন, ক্যাম্পাসে প্রভাব বিস্তার ও বহিরাগতদের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে ৩ থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়া, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি তোলারাম কলেজে সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। এসব ঘটনায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, শিক্ষা কার্যক্রমের স্বাভাবিক পরিবেশ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

 

মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন উদ্বেগজনক ঘটনা পরিলক্ষিত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত প্রকাশ, রাষ্ট্র ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সমালোচনা কিংবা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশকে কেন্দ্র করে মামলা, আটক, হয়রানি ও চাপ প্রয়োগের অভিযোগ এসেছে। একই সময়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি, লাঞ্ছনা, আটক ও আইনি পদক্ষেপের ঘটনাও তাদের নিরাপদ ও স্বাধীনভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

সীমান্ত এলাকাতেও গুলিবর্ষণ, নির্যাতন, স্থলমাইন বিস্ফোরণ ও হতাহতের ঘটনা সীমান্তবর্তী মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এসব ঘটনায় স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

 

নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, গণধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুকজনিত নির্যাতন, নারী হত্যা ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাও অব্যাহত ছিল। ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা, চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও আইনি সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপরাধীদের দ্রুত ও ন্যায়সংগত বিচারের আওতায় আনা জরুরি।

 

শ্রম অধিকার ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি পরিলক্ষিত হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা, শ্রমিকের মৃত্যু, নির্যাতন এবং গৃহকর্মীদের ওপর সহিংসতার অভিযোগ শ্রমিকদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করেছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ড, কলকাতায় হোটেলে অগ্নিকাণ্ড এবং ভূমধ্যসাগরে অভিবাসনপ্রত্যাশী বাংলাদেশিদের মৃত্যুর ঘটনা বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা, নিরাপদ অভিবাসন ও মানব পাচার প্রতিরোধের গুরুত্বকে সামনে এনেছে।

 

সামগ্রিকভাবে, আগস্ট ২০২৬-এর মানবাধিকার পরিস্থিতি আইনের শাসন, নাগরিক স্বাধীনতা, নিরাপদ জীবন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিতামূলক শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোকে তুলে ধরেছে। প্রতিটি অভিযোগ ও ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগীদের কার্যকর প্রতিকার, দায়ীদের জবাবদিহি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠনের অধিকার এবং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।

 

বাংলাদেশের ১৬ টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এর সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের আগস্ট মাসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে নিন্মোক্ত তথ্য উঠে এসেছে:

 

রাজনৈতিক সহিংসতা

আগস্ট মাসে কমপক্ষে ৭০টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৭ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৫৩৬ জন। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ ও হামলা, দলীয় ও অন্তকোন্দল, ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। আগস্ট মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় হতাহতের সংখ্যা জুলাই মাসের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে । গত জুলাই মাসে ৪৫ টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬ জন এবং আহত হয়েছেন ১৬৪ জন।

আগস্ট মাসে সহিংসতার অন্তত ৭০টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ২০টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৫২ জন ও নিহত ৫ জন। ১৮ টি বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ২৩৩ জন ও নিহত ১ জন। ৭ টি বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে আহত ২৬ জন ও নিহত ১ জন। । ৬ টি বিএনপি-এনসিপি মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৬ জন, ১০ টি বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষে ৩৮ জন আহত হয়েছেন। বিভিন্ন দলের মধ্যে ৯ টি ঘটনায়  আহত হয়েছেন ৭১ জন । নিহত ৭ জনের মধ্যে বিএনপির ৫ জন, আওয়ামী লীগের ১ জন ও জামায়াতের ১ জন।

এসকল ঘটনার মধ্যে ক্যাম্পাস কেন্দ্রীক ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের অন্তত ১৩ টি ঘটনায় আহত হয়েছে ২১৬ জন। এর মধ্যে ছাত্রদল-শিবির ৮ টি ঘটনায় ১৮১ জন এবং ছাত্রদল, অন্যান্য ছাত্র সংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫টি ঘটনায় ৩৫ জন আহত হয়েছে।

এর পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ৪ টি ঘটনায় ৩ জন আহত এবং ২ জন নিহত হযেছেন। অন্তত ১২ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এছাড়াও সারাদেশে আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রীক ১৯ টি ঘটনায় অর্ধশতাধিক বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

 

 

ক্রম

রাজনৈতিক দলসমূহ

ঘটনা

আহত

নিহত

১

বিএনপি- বিএনপি

২০

১৫২

৫

২

বিএনপি-জামায়াত 

১৮

২৩৩

১

৩

বিএনপি-আওয়ামী লীগ

৭

২৬

১

৪

বিএনপি-এনসিপি

৬

১৬

 

৫

বিএনপি-অন্যান্য দল

১০

৩৮

 

৬

অন্যান্য দলের মধ্যে

৯

৭১

 

মোট

৭০

৫৩৬

৭

 

নির্বাচনী সহিংসতা

আগস্ট ২০২৬ মাসে আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রার্থী ও তাঁদের কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলার ঘটনাও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। গত ৫ আগস্ট কুষ্টিয়ার খোকসা পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মেয়র প্রার্থী ও খোকসা উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাফিজ আহমেদ খান রাজুর ওপর সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। খোকসা থানাপাড়া এলাকায় নিজ বাড়ির গেটের সামনে সংঘটিত এ হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। হামলার সময় ব্যাপক গুলিবর্ষণ ও ককটেল বিস্ফোরণের ফলে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের সশস্ত্র হামলা নির্বাচনে প্রার্থীদের নিরাপত্তা, অবাধ রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং ভোটারদের মধ্যে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করে।

এছাড়া, গত ১১ আগস্ট সাতক্ষীরার তালা উপজেলার নগরঘাটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী এবাদুল ইসলামের ওপর সশস্ত্র হামলার অভিযোগ পাওয়া যায়। হামলায় প্রার্থী এবাদুল ইসলামসহ অন্তত আটজন কর্মী-সমর্থক আহত হন। ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, নগরঘাটা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মহব্বত হোসেন এবং সাংগঠনিক সম্পাদক আক্তারের নেতৃত্বে ছাত্রদল নেতা লাকি, রায়হান, সাকিব ও যুবদলের নেতাকর্মীরা এ হামলায় জড়িত ছিলেন। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা ও দায়ীদের শনাক্ত করা জরুরি।

 সভা-সমাবেশে বাঁধা

এ মাসে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপের একাধিক ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উক্ত সময়ে অন্তত ১৩ টি সভা ও সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা প্রদান করে, যার ফলে নির্ধারিত কর্মসূচি স্থগিত, ছত্রভঙ্গ অথবা বাতিল করতে বাধ্য হন আয়োজকরা। এই ধরনের হস্তক্ষেপের ফলে সংঘর্ষ ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং অন্তত ৬১ জন আহত ও ৮ জনকে সভা-সমাবেশস্থল থেকে আটক করা হয়েছে, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ পথচারীও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানী

এটি উদ্বেগজনক যে, এ মাসে অন্তত ৩২ টি নির্যাতনের ঘটনায় কমপক্ষে ৪৫ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সকল ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্ততপক্ষে ২৬ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ৬ জন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ৭ জন সাংবাদিক। ৫ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। এছাড়া সংবাদ প্রকাশের জেরে ১ টি মামলায় ১ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ এর আওয়ায় ১টি মামলা ১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। গত ২৫ আগস্ট শরীয়তপুরে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ক্যাম্পাসে সকালে ডেইলি স্টারের সাংবাদিক জাহিদ হাসান, নিউজ টুয়েন্টিফোর টেলিভিশন ও জাগো নিউজ প্রতিনিধি বিধান মজুমদার ও মানবকণ্ঠের জেলা প্রতিনিধি বরকত মোল্লাকে মারধর করা করা হয়। এমনকি মারধরের বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে আরেক সাংবাদিককে হুমকি দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘তোমরা লেখবা, আমরা পিডামু।’ এছাড়া গত ২৫ আগস্ট যশোরের শার্শা উপজেলার নাভারণ বুরুজবাগান উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে অ্যাডহক কমিটির সভা চলাকালীন সময় তথ্য সংগ্রহ করতে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছেন স্থানীয় পাঁচজন সাংবাদিক। হামলার শিকার পাঁচ সাংবাদিক হলেন- আনিসুর রহমান, আলমগীর হোসেন, সাহাবুদ্দিন আহম্মেদ, আতিকুজ্জামান রিমু ও রাহাত হোসেন।

মত প্রকাশের স্বাধীনতা

এ মাসে মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এমাসে অন্তত ৮ টি ঘটনায় ১০ জনকে আটক ও ৮ টি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় অন্তত ১১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সমালোচনায় ২জন, রাজনৈতিক ও অন্যান্য কন্টেন্ট তৈরি ১ জন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও কটুক্তির অভিযোগে ২ জন এবং অন্যান্য ইস্যুতে ৬ জনকে আটক করা হয়েছে।  অন্যদিকে সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬-এর বিভিন্ন ধারার অধীনে পৃথক ৪ টি মামলায় ৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, এসব ঘটনায় ৫ জনকে আটকও করা হয়েছে।

মব সহিংসতা ও গণপিটুনী

এ মাসে গণপিটুনী ও মব সহিংসতার কমপক্ষে ৫৩ টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ২৮ জন এবং আহত হয়েছেন ৬২ জন। গত ১৮ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায় গরু চুরির অভিযোগে গণপিটুনিতে কাজল মিয়া (৪৬) নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। গত ১৮ আগস্ট খুলনা মহানগরের বয়রা রায়েরমহল বড় মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে স্থানীয় লোকজনের গণপিটুনিতে রাজু বিশ্বাস নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়। গত ১৯ আগস্ট গাজীপুরের শ্রীপুরে প্রেমের ফাঁদে ফেলে আপত্তিকর ভিডিও ধারণ ও অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে এক নারীসহ চারজনকে আটক করে মারধর করার পর পুলিশে সোপর্দ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

অজ্ঞাত লাশ 

আগস্ট মাসে সারাদেশে নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থানে দুর্বৃত্তদের হাতে পরিকল্পিত বা অপরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ডের  ৮২ টি ঘটনায় ৮৭ টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে বস্তাবন্দি অবস্থায় ১২ টি, ঝুলন্ত অবস্থায় ১৭ টি, শরীরে একাধিক আঘাতসহ ২৬ টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া গলা কেটে হত্যা ৯ টি, হাত-পা বাঁধা ৮ টি লাশ পাওয়া গেছে। এছাড়া এর বাইরে নানা ধরণের পরিস্থিতিতে আরও ১৫ টি লাশ পাওয়া গেছে।

সীমান্তে হত্যা ও নির্যাতন

আগস্ট মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৮ টি ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হামলায় নিহত হয়েছেন ২ জন এবং আহত হয়েছেন ১ জন, যাদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে হয়েছন ৩ জন। এছাড়া ৫ জনকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সিমান্ত দিয়ে ৫ জনকে পুশইন এবং ১৮ জনকে পুশইনের চেষ্টা করা হয়েছে। গত ৯ আগস্ট মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সীমান্তের ওপারে ভারতের মাগুরুলি এলাকায় বিএসএফের গুলিতে তারা মিয়া (২০) এবং গত ৩০ আগস্ট পৃথক আরেকটি ঘটনায় হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার চিমটিবিল সীমান্তে সোহাগ মিয়া নামের এক বাংলাদেশি যুবক নিহত হন।

অপরদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ৩ টি সহিংসতার ঘটনায় ১জন নিহত ও ১ জন আহত হয়েছে। এছাড়া সীমান্ত থেকে ৩ জনকে আটক করা হয়েছে। গত ২৪ আগস্ট বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের মিয়ানমার অংশে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে মো. সাইফুল (২৫) নামে এক বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। বাঁশ কাটতে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে যাওয়ার পর পুঁতে রাখা ল্যান্ডমাইনের ওপর পা পড়লে বিস্ফোরণে তার দুই পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

কারা হেফাজতে মৃত্যু

এ মাসে সারাদেশে কারাগারে কমপক্ষে ৬ জন আসামী মারা গিয়েছেন। এর মধ্যে ১ জন জন কয়েদী ও ৫ জন হাজতী। মৃত ৬ জনের মধ্যে ১ জন আওয়ামীলীগ নেতা এবং বাকী ৫ জন সাধারণ কয়েদী। গত ৫ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের আইসিইউতে পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান খান মনির খান (৪৮) মারা যান। এছাড়া গত ২৬ আগস্ট সাজা শেষ হওয়ার একদিন আগে দিনাজপুর জেলা কারাগারে মো. নাদিম নামে এক কয়েদির মৃত্যূ হয়েছে।

 

শ্রমিক নির্যাতন

আগস্ট মাসে অন্তত ৮৪ টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৯ জন, আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৬৭ জন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় অন্তত ৬৩ জন শ্রমিক তাদের কর্মক্ষেত্রে মারা গেছেন। এছাড়া পৃথক দুইটি ঘটনায় ২ জন গৃহকর্মীর মৃত্যু ও ১ জন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। গত ১২ আগস্ট সিলেট নগরীর রায়নগরের রাজবাড়ী মিতালী আবাসিক এলাকার গৃহকর্তা আব্দুস সত্তার মিয়া (৮২), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭২) ও গৃহপরিচারিকা তাহমিনা (১৫) কে একই বাসায় গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। গত ১৫ আগস্ট রাজধানী ঢাকার  অপরদেক গত ১৫ আগস্ট চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে জাহাজের ভেতরে মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইডের বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে ১০ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন

আগস্ট মাসে কমপক্ষে ২৪৯ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অন্তত ৭৯ জন, যাদের মধ্যে ৪৬ (৫৮%) জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, ১৮ জন নারী ও কন্যা শিশু গণধর্ষনের শিকার হয়েছেন । অন্যদিকে ৯৩ জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন তন্মধ্যে শিশু ৩৮ জন। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত ৬ জন, আহত হয়েছেন ৭ জন নারী এবং ১ জন আত্মহত্যা করেছেন। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৪৯ জন, আহত হয়েছেন ৩১ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ২৩ জন নারী। গত ২ আগস্ট ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার তারাকান্দি এলাকায় ৯ বছর বয়সী এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের দাবি, শিশুটিকে ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়েছে। গত ২ আগস্ট নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলায় এক বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী তরুণীকে ধর্ষণ করে, পরে গ্রাম্য সালিশে বিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু বিয়ের ১৫ দিন পর তার শ্বশুর শাশুড়িসহ অন্যরা জোরপূর্বক ওষুধ খাইয়ে গর্ভের সন্তান নষ্ট করে দেন এবং তাকে বাবার বাড়িতে রেখে যাওয়া হয়। গত ১৭ আগস্ট গাজীপুরের কালিয়াকৈরে পারিবারিক বিরোধের জেরে ভাতিজার বউয়ের পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন রাশেদা বেগম (৪০) নামে এক গৃহবধূ। এমনকি গরম পানি ঢেলে চাচির মুখ ও ঘাড় ঝলসে দেওয়া হয়। গত ৬ আগস্ট অটো ছিনতাইয়ের ঘটনা দেখে ফেলায় রাজু আহম্মেদ নামে ১০ বছরের এক শিশুকে হত্যা করে জলাবদ্ধ ধানক্ষেতে পুতে রাখে দূর্বৃত্তরা। অনেক খোজাখুজির পরি শিশুটির অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

 

অন্যদিকে, এটি উদ্বেগজনক যে, ২৮২ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যাদের মধ্যে ৭৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ২০৫ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

 

মামলা ও গ্রেফতার

আগস্ট মাসে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে সংঘটিত বিভিন্ন সহিংসতা ও রাজনৈতিক ঘটনায় কমপক্ষে ৬২ টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় ১১২৫ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও প্রায় ২২০৯ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এছাড়া, একই মাসে রাজনৈতিক ও অন্যান্য মিলিয়ে মোট ১৬২ টি ঘটনায় অন্তত ১২৮২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের অন্তত ৪২৯ জন নেতাকর্মী, বিএনপির ২২ জন, জামায়াতে ইসলামির ৪ জন, এনসিপির ৯ জন এবং উগ্রপন্থী সংগঠনের ৫ জন সদস্য রয়েছে। এরমধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং সম্ভাব্য নাশকতা প্রতিরোধে আগস্ট মাসজুড়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়। এসব অভিযানে ১২৩৫৪ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।  

দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি, যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দৃঢ় হয় এবং মানুষের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে গণপিটুনী ও মব সহিংসতা, রাজনৈতিক উত্তেজনা, এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ-এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। তাই “এইচআরএসএস” সরকারের প্রতি মানবাধিকার রক্ষায় আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছে এবং একই সাথে সকল নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ  ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতি অধিক সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানাচ্ছে।

Reports Files

No Data Found!