Monthly Report
Monthly Human Rights Situation Report July 2026
বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি প্রতিবেদন (জুলাই -২০২৬)
জুলাই ২০২৬ মাসে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি রাজনৈতিক, সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলাজনিত নানা ঘটনার কারণে উল্লেখযোগ্যভাবে আলোচনায় ছিল। মাসজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, দলীয় অন্তর্কোন্দল, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, সভা-সমাবেশে বাধা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানি, মব সহিংসতা, সীমান্তে হতাহত, হেফাজতে ও কারাগারে মৃত্যু, শ্রমিক নির্যাতন, নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যৌথবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ অভিযান, বিপুলসংখ্যক গ্রেপ্তার এবং বিভিন্ন ঘটনায় মামলা দায়ের নাগরিক স্বাধীনতা, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা নিয়ে জনপরিসরে নতুন করে আলোচনা ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
পর্যালোচনাধীন সময়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা অব্যাহত ছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ, আন্তঃদলীয় সংঘর্ষ, আধিপত্য বিস্তার এবং চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ঘটনায় প্রাণহানি ও আহতের ঘটনা ঘটেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশে বাধা, কর্মসূচি পণ্ড করে দেওয়া কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপের অভিযোগ গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত প্রকাশ, রাষ্ট্র ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে সমালোচনা অথবা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশকে কেন্দ্র করে মামলা, আটক, হয়রানি ও চাপের অভিযোগ সামনে এসেছে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, লাঞ্ছনা, হুমকি, আটক এবং সংবাদ প্রকাশের জেরে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের ঘটনাগুলো সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্ষেত্রেও হত্যাকাণ্ড, মব সহিংসতা, গণপিটুনি, চাঁদাবাজি, অপহরণ, অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার এবং অন্যান্য সহিংস অপরাধ জননিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি হেফাজতে মৃত্যু, কারাগারে বন্দিদের মৃত্যু এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের সময় প্রাণহানির ঘটনাগুলো স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং কার্যকর জবাবদিহিতার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে। সীমান্ত এলাকায় গুলিবর্ষণ, নির্যাতন, স্থলমাইন বিস্ফোরণ এবং হতাহতের ঘটনাও সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও মানবাধিকার সুরক্ষার প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
এ মাসে নারী ও শিশুদের মানবাধিকার পরিস্থিতিও গভীর উদ্বেগের বিষয় ছিল। ধর্ষণ, গণধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুক-সংক্রান্ত নির্যাতন, নারী হত্যা এবং শিশু নির্যাতনের ঘটনা দেশের বিভিন্ন স্থানে অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা, শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা এবং গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ শ্রম অধিকার ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।
বাংলাদেশের ১৬ টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এর সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের জুলাই মাসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে নিন্মোক্ত তথ্য উঠে এসেছে:
রাজনৈতিক সহিংসতা
জুলাই মাসে কমপক্ষে ৪৫ টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৬ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৬৪ জন। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ ও হামলা, দলীয় ও অন্তকোন্দল, ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। জুলাই মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় হতাহতের সংখ্যা জুন মাসের তুলনায় কমেছে । গত জুন মাসে ৫৮ টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৯ জন এবং আহত হয়েছেন ৩৪৬ জন।
জুলাই মাসে সহিংসতার অন্তত ৪৫ টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ১৪ টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৪৮ জন ও নিহত ০৩ জন। ০৬ টি বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৪৪ জন, ৩ টি বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে আহত ১৩ জন । ০৫ টি বিএনপি-এনসিপি মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৩৮ জন, ১৪ টি বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষে ১৬ জন আহত হয়েছেন। বিভিন্ন দলের মধ্যে ০৩ টি ঘটনায় নিহত ০৩ জন ও আহত ৫ জন । নিহত ৬ জনের মধ্যে বিএনপির ৩ জন, ও জেএসএস ও ইউপিডিএফের ৩ জন।
|
ক্রম |
রাজনৈতিক দলসমূহ |
ঘটনা |
আহত |
নিহত |
|
১ |
বিএনপি- বিএনপি |
১৪ |
৪৮ |
০৩ |
|
২ |
বিএনপি-জামায়াত |
৬ |
৪৪ |
|
|
৩ |
বিএনপি-আওয়ামী লীগ |
৩ |
১৩ |
|
|
৪ |
বিএনপি-এনসিপি |
৫ |
৩৮ |
|
|
৫ |
বিএনপি-অন্যান্য দল |
১৪ |
১৬ |
|
|
৬ |
অন্যান্য দলের মধ্যে |
০৩ |
৫ |
৩ |
|
মোট |
৪৫ |
১৬৪ |
০৬ |
|
এর পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ৭ টি ঘটনায় ২ জন আহত এবং ০৫ জন নিহত হযেছেন। নিহতদের মধ্যে আওয়ামীলীগের ১ জন, ও বিএনপির ৪ জন। অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এছাড়াও সারাদেশে আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রীক ৯ টি ঘটনায় অন্তত ৪০ টি বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
সভা-সমাবেশে বাঁধা
এ মাসে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপের একাধিক ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উক্ত সময়ে অন্তত ০৯ টি সভা ও সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা প্রদান করে, যার ফলে নির্ধারিত কর্মসূচি স্থগিত, ছত্রভঙ্গ অথবা বাতিল করতে বাধ্য হন আয়োজকরা। এই ধরনের হস্তক্ষেপের ফলে সংঘর্ষ ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং অন্তত ২০ জন আহত হয়েছে, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ পথচারীও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানী
এটি উদ্বেগজনক যে, এ মাসে অন্তত ৩৬ টি নির্যাতনের ঘটনায় কমপক্ষে ৫৫ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সকল ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্ততপক্ষে ২১ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ৯ জন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ৮ জন সাংবাদিক। ৩ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। এছাড়া সংবাদ প্রকাশের জেরে মানহানির ইস্যুতে ৮ টি মামলায় ১৪ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে, এর মধ্যে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ এর আওয়ায় ২টি মামলা হয়েছে। গত ১৬ জুলাই হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এর কার্যালয়ে অবৈধ সিলিকা বালু উত্তোলন ও মাদক কারবারের সংবাদ প্রকাশের জেরে দৈনিক ইনকিলাব ও এনপিবি নিউজ -এর বাহুবল উপজেলা প্রতিনিধি হাবিবুর রহমান নোমান ও সাংবাদিক গোলাম মোস্তফা সৈবালের উপর হামলা চালানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বাহুবল উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আব্দুর রকিব সহ কয়েকজন এ সংবাদিকদেরর উপর হামলা চালান। গত ২৮ জুলাই পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আসাদুজ্জামান সুমন আজকের বসুন্ধরার সাংবাদিক লালন সরকারকে বেধড়ক মারধর করে। এমনকি মারধরের পর ভুক্তভোগী সাংবাদিককে থানায় হস্তান্তর ও চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের অভিযোগ।
মত প্রকাশের স্বাধীনতা
এ মাসে মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে ঘটেছে। এমাসে অন্তত ০৮ টি ঘটনায় ০৮ জনকে আটক ও ০৮ টি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় অন্তত ২৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে স্পীকারকে নিয়ে সমালোচনায় ১জন, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার স্ত্রীকে নিয়ে কটুক্তিতে ১ জন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও কটুক্তির অভিযোগে ৩ জন এবং অন্যান্য ইস্যুতে ৩ জনকে আটক করা হয়েছে। অন্যদিকে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫-এর বিভিন্ন ধারার অধীনে পৃথক ৩ টি মামলায় ১৭ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ৩ জনকে আটকও করা হয়েছে।
মব সহিংসতা ও গণপিটুনী
এ মাসে গণপিটুনী ও মব সহিংসতার কমপক্ষে ৪৯ টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১৭ জন এবং আহত হয়েছেন ৫১ জন। গত ৫ জুলাই নারায়ণগঞ্জ শহরের পশ্চিম মাসদাইরে ছিনতাইকারী আখ্যা দিয়ে বিদ্যুতের খুঁটিতে বেঁধে জিসান (২৫) নামের এক তরুণকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় অনিক নামের আরেক তরুণ গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওর তথ্যমতে, বিদ্যুতের খুঁটিতে রশি দিয়ে বাঁধা দুই তরুণকে স্টিলের পাইপ ও লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করছেন স্থানীয় কয়েকজন। এছাড়া গত ২১ জুলাই নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় চুরির অভিযোগে দুই দিন আটকে রেখে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনের পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় নয়ন হাওলাদার (৪২) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। নিহতের স্ত্রীর অভিযোগ, ৫০ হাজার টাকা চুরির অভিযোগে দুইদিন ধরে আটকে রেখে বিদ্যুতের তার এনে নয়নের শরীরে শক দেয় এবং বাম হাতের কব্জি ও আঙ্গুল গুলো মুচড়িয়ে ভেঙ্গে দেয়।
অজ্ঞাত লাশ
জুলাই মাসে সারাদেশ নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থানে দুর্বৃত্তদের হাতে পরিকল্পিত বা অপরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ডের ১৩৭ টি ঘটনায় ১৪৬ টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে বস্তাবন্দি অবস্থায় ০৬ টি, ঝুলন্ত অবস্থায় ২৬ টি, শরীরে একাধিক আঘাতসহ ৯ টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া গলা কেটে হত্যা ৪ টি, হাত-পা বাঁধা ২ টি লাশ পাওয়া গেছে। এছাড়া এর বাইরে নানা ধরণের পরিস্থিতিতে আরও ৯৯ টি লাশ পাওয়া গেছে।
সীমান্তে হত্যা ও নির্যাতন
গত ১০ জুলাই সিলেটের গোয়াইনঘাট সীমান্তে ভারতীয় স্থানীয় বাসিন্দা খাসিয়াদের গুলিতে মিনহাজ উদ্দিন (২৫) নামে এক বাংলাদেশি যুবক নিহত হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে, ঘটনার দিন দিবাগত রাত ৩টার দিকে মিনহাজ উদ্দিন উপজেলার সোনারহাট-লাখাট সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের লাখাট স্টেশনসংলগ্ন এলাকায় প্রবেশ করলে খাসিয়ারা তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে তিনি গুলিবিদ্ধ হন।
এছাড়া গত ২৮ জুলাই বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার জারুলিয়াছড়ি সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে আরাকান আর্মি কর্তৃক পুতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে আবদুল করিম (২৫) নামের এক বাংলাদেশি যুবক গুরুতর আহত হয়েছেন। বিস্ফোরণে তাঁর বাঁ পায়ের হাঁটুর নিচের অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
বিচার বহির্ভূত হত্যা (হেফাজতে/নির্যাতনে/গুলি/বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যু)
দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, ভুক্তভোগীর পরিবার ও এইচআরএসএসের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে ৩ জন মারা গেছেন । গত ৯ জুলাই শোরগঞ্জের নিকলী থানা–হাজত থেকে রুবেল মিয়া (২১) নামের এক আসামির ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। গত ২০ জুলাই বগুড়া জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে থাকা আসাদুজ্জামান আসাদ (২৫) নামের এক আসামির মৃত্যু হয়েছে। জানা যায়, গত ২৯ জুন সারিয়াকান্দিতে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক আবদুল মান্নান মোল্লা (৪৫) হত্যা মামলার মামলার প্রধান আসামি হিসেবে আসাদকে গ্রেপ্তার করে জেলা ডিবি পুলিশ। তবে আটকের পরে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাজতখানার ওয়াশরুমে তার লাশ পাওয়া যায়। গত ৩০ জুলাই দপুরের ফরিদগঞ্জে সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার মিজানুর রহমান (৫৫) নামে এক ব্যক্তি পুলিশ হেফাজতে মারা গেছেন।
কারা হেফাজতে মৃত্যু
এ মাসে সারাদেশে কারাগারে কমপক্ষে ১০ জন আসামী মারা গিয়েছেন। এর মধ্যে ২জন জন কয়েদী ও ৮ জন হাজতী। মৃত ১০ জনের মধ্যে ২ জন আওয়ামীলীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের এবং বাকী ৮ জন সাধারণ কয়েদী। চলতি মাসের ১৫ জুলাই থেকে ২৫ জুলাই ১০ দিনের ব্যবধানে সিরাজগঞ্জ জেলা কারাগারে তিন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জুলাই অসুস্থ হয়ে পড়ার পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের শাহজাদপুর ইউনিয়ন নেতা আমিনুল ইসলাম লিটন (৪৭), ২৩ জুলাই সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার রতনকান্দি ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক বাবলু মন্ডল (৫২), এবং ২৫ জুলাই ঢাকার প্রিজন হাসপাতালে কাওসার হোসেন (২২) নামে এক বন্দী চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।
শ্রমিক নির্যাতন
জুলাই মাসে অন্তত ৭৯ টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৩ জন, আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৭২ জন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় অন্তত ৫৫ জন শ্রমিক তাদের কর্মক্ষেত্রে মারা গেছেন। এছাড়া পৃথক দুইটি ঘটনায় ২জন গৃহকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। গত ৩১ জুলাই নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের সাইলো গেট এলাকায় সাদ্দাম সরদার (৩৫) নামে এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, তাঁর তাঁর ডান হাতের চামড়া উঠে যাওয়া, পেটে কালচে আঘাতের চিহ্ন এবং দুই পায়ে বেধড়ক পিটুনির ছাপ ও ঝলসে যাওয়ার ক্ষতচিহ্ন রয়েছে। গত ২৪ জুলাই ফেনীর পরশুরামে উপজেলা গেটসংলগ্ন কাদের টাওয়ারের একটি আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাট থেকে ফারহানা আক্তার প্রিয়া (১৬) নামে এক গৃহকর্মীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
নারী ও শিশু নির্যাতন
জুলাই মাসে কমপক্ষে ২৫৮ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অন্তত ৯৫ জন, যাদের মধ্যে ৬১ (৬৪%) জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, ১১ জন নারী ও কন্যা শিশু গণধর্ষনের শিকার হয়েছেন । অন্যদিকে ৭৮ জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন তন্মধ্যে শিশু ৪০ জন। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত ১ জন, আহত হয়েছেন ৬ জন নারী। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৪৫ জন, আহত হয়েছেন ১০ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ২৩ জন নারী।
গত ৬ জুলাই মৌলভীবাজারে রাজনগর উপজেলায় রাজনগর উপজেলার মুন্সীবাজার ইউনিয়নের করিমপুর গ্রামে আলমগীর হোসেন নামে স্থানীয় এক বাসিন্দার বাড়ির উঠান খুঁড়ে নিজ স্ত্রী জাহেদা বেগমের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্ত্রীকে হত্যার পর মরদেহ মাটিচাপা দেওয়ার অভিযোগে আলমগীর হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত মাসের ২৪ জুন জুলাই রাজধানীর মিরপুরের বড়বাগ এলাকায় যৌতুকের অর্থ না এনে দেওয়ায় স্বামী সোহেল কেরোসিন ঢেলে গৃহবধূ শিফা আক্তার (১৯) এর গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে ৫ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিংসাধীন অবস্থায় শেফার মৃত্যু হয়। শিফার বাবা জাহাঙ্গীর আলমের অভিযোগ, বিয়ের সময় ছয় ভরি সোনা ও নগদ দুই লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পাঁচ ভরি সোনা ও কিছু টাকা দেওয়া হলেও বাকি দাবিকৃত সোনা ও টাকা দিতে না পারায় সোহেল তাঁর মেয়ের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন।
অন্যদিকে, এটি উদ্বেগজনক যে, ১৮০ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যাদের মধ্যে ৩৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১৪৬ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
মামলা ও গ্রেফতার
জুলাই মাসে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে সংঘটিত বিভিন্ন সহিংসতা ও রাজনৈতিক ঘটনায় কমপক্ষে ৪১ টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় ৮৮৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও প্রায় ৫০১৯ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এছাড়া, একই মাসে রাজনৈতিক ও অন্যান্য মিলিয়ে মোট ১৯৩টি ঘটনায় অন্তত ৯১৫৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের অন্তত ৩১৮ জন নেতাকর্মী, বিএনপির ২৮ জন, জামায়াতে ইসলামির ১ জন, এবং এনসিপির ৭ জন সদস্য রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং সম্ভাব্য নাশকতা প্রতিরোধে জুলাইজুড়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়। এসব অভিযানে ৮,৭৯৫ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের উল্লেখযোগ্য অংশ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মী, মাদকব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী ও বিভিন্ন উগ্রপন্থী সংগঠনের সদস্য। পাশাপাশি, সন্ত্রাস, নাশকতা, পরোয়ানাভুক্ত আসামি গ্রেপ্তার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে নিয়মিত অভিযানও অব্যাহত ছিল। এদিকে, একই সময়ে পরিচালিত মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি, যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দৃঢ় হয় এবং মানুষের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে গণপিটুনী ও মব সহিংসতা, রাজনৈতিক উত্তেজনা, এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ-এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। তাই “এইচআরএসএস” সরকারের প্রতি মানবাধিকার রক্ষায় আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছে এবং একই সাথে সকল নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতি অধিক সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানাচ্ছে।
Reports Files
-
HR Report (July-2026) - English
