Monthly Report
Monthly Human Rights Situation Report May 2026
বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি প্রতিবেদন (মে-২০২৬)
বাংলাদেশে মে ২০২৬ মাসে মানবাধিকার পরিস্থিতি নানা চ্যালেঞ্জ ও উদ্বেগের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নারী ও শিশুর নিরাপত্তা এবং সীমান্ত পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংঘটিত ঘটনাবলি দেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করেছে।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, মাসজুড়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি, সভা-সমাবেশ ও মিছিলকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, সহিংসতা এবং প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। এসব ঘটনা নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত প্রকাশ এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় তুলে ধরাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের হয়রানি ও চাপের অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা প্রদানের ঘটনাগুলো স্বাধীন সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যমের নিরাপত্তা সম্পর্কে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ড, গণপিটুনি, চাঁদাবাজি, মাজারে হামলা এবং অন্যান্য সহিংস অপরাধের ঘটনা জননিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুর মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উদ্বেগের। ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, পারিবারিক সহিংসতা, নারী হত্যা এবং শিশু নির্যাতনের ঘটনা অব্যাহত থেকেছে। অনলাইন ও অফলাইন উভয় ক্ষেত্রেই নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে গুরুতর চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
এছাড়া শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনা ও সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এমন কিছু ঘটনাও মাসজুড়ে পরিলক্ষিত হয়েছে, যা সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগের কারণ।
সীমান্ত এলাকায় বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক রয়ে গেছে। সীমান্তে গুলি, নির্যাতন, আটক, পুশইন এবং হতাহতের ঘটনাগুলো দুই দেশের সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার ও নিরাপত্তা প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, গত তিন মাসে হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা ও টিকা ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা, চিকিৎসা সুবিধার ঘাটতি এবং স্বাস্থ্যসেবার অপর্যাপ্ততার কারণে দেশব্যাপী ৬ শতাধিক শিশুর মৃত্যুর তথ্য সামনে এসেছে। একই সঙ্গে ঈদুল আজহা উপলক্ষে সড়ক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি এবং চালকদের বেপরোয়া যানবাহন চালানোর ফলে সংঘটিত বিভিন্ন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় তিন শতাধিক মানুষের প্রাণহানির ঘটনা উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, মে ২০২৬ মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি নাগরিক অধিকার সুরক্ষা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা জোরদারের প্রয়োজনীয়তাকে পুনরায় সামনে নিয়ে এসেছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, কার্যকর প্রতিকার এবং নাগরিক স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দেশের গণতান্ত্রিক ও মানবিক অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য।
বাংলাদেশের ১৬ টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এর সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের মে মাসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে নিন্মোক্ত তথ্য উঠে এসেছে:
রাজনৈতিক সহিংসতা
মে মাসে কমপক্ষে ৬৪ টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৫ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২৮৯ জন। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ ও হামলা, দলীয় ও অন্তকোন্দল, ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। মে মাসে রাজনৈতিক সহিংসতা ও হতাহতের সংখ্যা এপ্রিল মাসের তুলনায় কমেছে। গত এপ্রিল মাসে ৯৮ টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬ জন এবং আহত হয়েছেন ৫৩৩ জন।
মে মাসে সহিংসতার ৬৪ টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ১৮ টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১১৪ জন। ১০ টি বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৪৯ জন ও নিহত হয়েছেন ১ জন, ১৪ টি বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৭২ জন ও নিহত হয়েছেন ২ জন। ২ টি বিএনপি-এনসিপি মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ২ জন, ১১ টি বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ২৭ জন। বিভিন্ন দলের মধ্যে ০৭ টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ২৫ জন । এছাড়া, ২ টি ঘটনায় ইউপিডিএফ এর ২ জন সদস্য নিহত হয়েছেন। নিহত ৫ জনের মধ্যে বিএনপির ১ জন, জামায়াতের ১ জন, পার্বত্য চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফের ২ জন ও একজন সাধারণ মহিলা।
এসব ঘটনার মধ্যে ক্যাম্পাস কেন্দ্রীক ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের ৬ টি ঘটনায় আহত হয়েছে ১৫ জন। এর মধ্যে ছাত্রদল-শিবির ২ টি ঘটনায় ২ জন, ছাত্রদল, অন্যান্য ছাত্র সংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৪টি ঘটনায় ১১ জন আহত হয়েছে।
|
ক্রম |
রাজনৈতিক দলসমূহ |
ঘটনা |
আহত |
নিহত |
|
১ |
বিএনপি- বিএনপি |
১৮ |
১১৪ |
|
|
২ |
বিএনপি-জামায়াত |
১০ |
৪৯ |
১ |
|
৩ |
বিএনপি-আওয়ামী লীগ |
১৪ |
৭২ |
২ |
|
৪ |
বিএনপি-এনসিপি |
২ |
২ |
|
|
৫ |
বিএনপি-অন্যান্য দল |
১১ |
২৭ |
|
|
৬ |
অন্যান্য দলের মধ্যে |
৭ |
২৫ |
|
|
৭ |
ইউপিডিএফ- অন্যান্য দল |
২ |
|
২ |
|
মোট |
৬৪ |
২৮৯ |
৫ |
|
এর পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ৫ টি ঘটনায় কমপক্ষে ৭ জন আহত এবং ১ নিহত হয়েছেন । অন্তত ১১ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এছাড়াও সারাদেশে আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রীক ৮ টি ঘটনায় অন্তত ১৩৪ টি বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠা, দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানী
এটি উদ্বেগজনক যে, এ মাসে অন্তত ৩৯ টি নির্যাতনের ঘটনায় কমপক্ষে ৭৮ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সকল ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্ততপক্ষে ৪২ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ১৮ জন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ০৯ জন সাংবাদিক। ১ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। এছাড়া ২ টি মামলায় ৮ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। গত ২১ মে চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় এক শিশু ধর্ষণচেষ্টার ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের অবরোধ নিয়ন্ত্রণে ছোড়া গুলিতে দুইজন সাংবাদিক আহত হন। গত ৭ মে খাগড়াছড়িতে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা ও সময় টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি জীতেন কুমার বড়ুয়াকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দায়ের করা ৫টি মামলায় গ্রেফতার করে পুলিশ।
মব সহিংসতা ও গণপিটুনী
এ মাসে গণপিটুনী ও মব সহিংসতার কমপক্ষে ৬৬ টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৩১ জন এবং আহত হয়েছেন ৬৮ জন। গত ৩ মে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলায় বহুমানুষকে ট্রাক চাপা দেওয়ার গুজব রটিয়ে হান্নান শেখ (৩৫) নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করে স্থানীয়রা। গত ৯ মে গাজীপুরের কালিয়কৈর উপজেলার বাগচালা এলাকায় গরু চুরির অভিযোগে এলাকাবাসী তিন সদস্যকে গণপিটুনী দেয়, এতে ঘটনাস্থলের তিনজনের মৃত্যু হয়। এছাড়া গত ১৭ মে চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমাডাঙ্গা উপজেলার আসাননগর গ্রামে ভ্যান গাড়ি চুরির অভিযোগ দুদু (২২) নামে এক যুবককে পিটুনীতে নৃশংসভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়, এমনকি হত্যার আগে অভিযুক্তের শরীরে গরম পানি ঢেলে নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে।
নারী ও শিশু নির্যাতন
মে মাসে কমপক্ষে ৩০৫ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অন্তত ৮৩ জন, যাদের মধ্যে ৫৭ (৭০%) জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, ১৭ জন নারী ও কন্যা শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ধর্ষণেরর পর হত্যা করা হয়েছে ৬ জনকে যাদের মধ্যে শিশু ৪ জন । ৭৬ জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন তন্মধ্যে শিশু ৪২ জন। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৬৩ জন, আহত হয়েছেন ৩১ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ৪৫ জন নারী। এছাড়া, যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত ৩, আহত ৪, এবং আত্মহত্যা করেছেন ১ জন নারী। অন্যদিকে এসিড নিক্ষেপ ঘটনায় আহত হয়েছেন ১ জন নারী। গত ১৯ মে রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী এলাকায় ৭ বছরের শিশুকে রামিসা আক্তারকে পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া সোহেল রানা (৩০ ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করে। গত ০৩ মে ফরিদপুরে ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে আইরিন আক্তার কবিতা (৭) নামে এক শিশুকে শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনা ঘটে। ২২ মে নওগাঁ জেলায় যৌতুকের টাকা না পেয়ে রেহানা (২০) নামে এক গৃহবধূকে পিটিয়ে হত্যা করেছে তার স্বামী ও শাশুড়ি। ৩০ মে জামালপুরের ইসলামপুর গভীর রাতে অ্যাসিড নিক্ষেপ করে আখিয়া আক্তার (২৮) নামে এক নারীকে আহত করার ঘটনা ঘটে।
অন্যদিকে, এটি উদ্বেগজনক যে, মে মাসে অন্তত ২১৫ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যাদের মধ্যে ৫৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ২১১ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এছাড়া বিগত তিন মাসে হামের উপসর্গে টিকার অব্যবস্থাপনা, অপর্যাপ্ততা ও উন্নত চিকিৎসার অভাবে সারাদেশে অন্তত ৬ শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ২৭ মে রাজধানীর মগবাজারে আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অব্যবস্থাপনার কারনে একসাথে ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
মত প্রকাশের স্বাধীনতা
এ মাসে মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এমাসে অন্তত ১১ টি ঘটনায় ০৬ জনকে আটক ও ৭ টি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় অন্তত ১২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সমালোচনা করে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ায় ১ জন, ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নেতাকর্মীদের সমালোচনায় ৬ জন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও কটুক্তির অভিযোগে ২ জন এবং অন্যান্য ইস্যুতে ০১ জনকে আটক করা হয়েছে। অন্যদিকে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫-এর বিভিন্ন ধারার অধীনে পৃথক ৫ টি মামলায় ১২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
সভা-সমাবেশে বাঁধা
এ মাসে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপের একাধিক ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উক্ত সময়ে অন্তত ১০ টি সভা ও সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা প্রদান করে, যার ফলে নির্ধারিত কর্মসূচি স্থগিত, ছত্রভঙ্গ অথবা বাতিল করতে বাধ্য হন আয়োজকরা। এই ধরনের হস্তক্ষেপের ফলে সংঘর্ষ ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং অন্তত ৪১ জন আহত হয়েছে, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ পথচারীও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। গত ১৭মে গাজীপুরের ঢাকা প্রকৌশল ও পযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, এতে পুলিশসহ অন্তত ২৫ জন আহত হন।
সীমান্তে হত্যা ও নির্যাতন
মে মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ০৬ টি ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হামলায় নিহত হয়েছেন ০৪ জন এবং আহত হয়েছেন ২০ জন, যাদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন ০৩ জন। এছাড়া ১৪ জনকে আটক করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে কমপক্ষে ১৬৬ জনকে বাংলাদেশে পুশইন করেছে বিএসএফ। গত ০৯ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় ভারতীয় সীমান্তে বিএসএফের ছোড়া গুলিতে মো. মুরসালিন (২০) ও নবীন হোসেন (৫৫) নামে দুই বাংলাদেশী নিহত হন। এছাড়া গত ১৪ মে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার আমঝোল সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এর গুলিতে খাদিমুল ইসলাম (২৫) নামে এক বাংলাদেশী যুবক নিহত হন।
অপরদিকে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে পুতে রাখা স্থলমাইন বিষ্ফোরনে ৩ জন নিহত ও ১ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া ৪টি ঘটনায় ১৮ জনকে আটক করেছেন আরাকান আর্মি। গত ২৪ মে বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম এলাকায় আরাকান আর্মি কর্তৃক পুতে রাখা স্থলমাইন বিষ্ফোরনে লেয়ারা (৪১), অংকেমন (৫০) ও চিংকা অং (৪০) নামে তিন স্থানীয় নিহত হন।
ধর্মীয় ও সংখ্যালঘু নির্যাতন
এটি উদ্বেগজনক যে, এ মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর কমপক্ষে ০৩ টি হামলার ঘটনায় ৫ জন আহত হয়েছেন এবং ৬ টি বসতবাড়ি হামলা ও ভাঙচুর এবং ১টি ভূমি দখলের ঘটনা ঘটেছে। গত ৪ মে বাগেরহাট জেলার শরনখোলায়র রতিয়া রাজাপুর গ্রামে জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে রবীন ঢালী নামে একটি সংখ্যালঘু (হিন্দু) পরিবারের উপর হামলা, বসতঘর ও আসবাবপত্র ভাংচুর, ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এসময় বাড়িতে থাকা ৫ জন নারী সদস্য সন্ত্রাসীদের মারধরের শিকার হন।
এছাড়া কুষ্টিয়া ও ঢাকায় পৃথক ২ টি মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে, এসময়ে বেশ কয়েকজন আহত হন। গত ১৪ মে মধ্যরাতে ঢাকাস্থ মিরপুরে হযরত শাহ আলী (র) এর মাজারে লাঠিসোঁটা ও লোহার পাইপ নিয়ে হামলা চালানো হয়, এসময় বেশ কয়েকজন মাজারের ভক্ত ও দর্শনার্থী আহত হন।
বিচার বহির্ভূত হত্যা (হেফাজতে/নির্যাতনে/গুলি/বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যু)
দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, ভিকটিমের পরিবার ও এইচআরএসএস এর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ মে সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের শতমুখী খাল এলাকায় কাঁকড়া আহরণের সময় বন বিভাগের কর্মীদের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে আমিনুর রহমান গাজী (৪৫) নামে এক জেলে নিহত হয়েছেন। নিহত আমিনুর রহমান সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের ৯ নম্বর সোরা এলাকার বাসিন্দা। এছাড়া গত ১৩ মে জামালপুরে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) এর মাদকবিরোধী অভিযানের সময় পালাতে গিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে ঝাঁপ দিয়ে আল আমিন (২৬) নামে যুবক নিহত হয়েছেন।
কারা হেফাজতে মৃত্যু
এ মাসে সারাদেশে কারাগারে কমপক্ষে ৭ জন আসামী মারা গিয়েছেন। এর মধ্যে ৪ জন জন কয়েদী ও ৩ জন হাজতী। এর মধ্যে আওয়ামীলীগের ১ জন এবং অন্যান্য ৬ জন। গত ১৯ মে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে জুলাই-আগস্টের হত্যা মামলার আসামী ও কারাবন্দী দেবাশীষ চৌধুরী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তবে মৃতের পরিবারের অভিযোগ, কারাগারের ভিতর নির্যাতনে দেবাশীষ চৌধুরীরর মৃত্যূ হয়েছে। এছাড়া, গত ২৫ মে সাতক্ষীরা জেলা কারাগারে বন্দী অবস্থায় জেলা জজকোটের সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ও জেলা আওয়ামীলীগের উপদেষ্টা আব্দুল লতিফ চিকিংসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
দূর্বৃত্তের হামলায় নিহত ও অজ্ঞাত লাশ
মে মাসে মোট ২৮টি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে গলা কেটে হত্যার শিকার ৬ জন, শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্নসহ ৫ জন এবং গলে যাওয়া অবস্থায় ৫ জনের মরদেহ পাওয়া যায়। এছাড়া অন্যান্য কারণে নিহত বা অজ্ঞাত পরিস্থিতিতে উদ্ধার হওয়া মরদেহের সংখ্যা ছিল ১২টি।
এছাড়া দূর্বৃত্তের হামলার ১২২টি ঘটনায় ১৩০ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে নারী ১৭জন, রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ৮জন, ব্যবসায়ী ২৫জন, শিক্ষার্থী ৩ জন, দিনমজুর ও শ্রমিক ২০ জন এবং ৫৯ জন অন্যান্য পরিচয়ধারী যুবক ও বৃদ্ধের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
শ্রমিক নির্যাতন
মে মাসে অন্তত ৫৭ টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২০ জন, আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৩০ জন। এছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় অন্তত ৪১ জন শ্রমিক তাদের কর্মক্ষেত্রে মারা গেছেন। গত ১৫ মে ঢাকার চকবাজারের কামালবাগে একটি প্লাস্টিক বর্জ্যের কারখানার গুদাম থেকে ইউনুস মিয়া (৪০) নামে এক শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়, এসময় তার শরীর ও মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিলো।
মামলা ও গ্রেফতার
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে সংঘটিত বিভিন্ন সহিংসতা ও রাজনৈতিক ঘটনায় কমপক্ষে ২৩ টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় ৪০৫ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও প্রায় ৯৩২ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এছাড়া, একই মাসে রাজনৈতিক ও অন্যান্য মিলিয়ে মোট ২১২টি ঘটনায় অন্তত ৩৩১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের অন্তত ২৪৬ জন নেতাকর্মী, বিএনপির ৬৪ জন, জামায়াতে ইসলামির ১২ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৯ সদস্য রয়েছেন বলে জানা গেছে। একই সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সারাদেশে যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়। এসব অভিযানে ১,৯৩৫ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের একটি বড় অংশ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন উগ্রপন্থী সংগঠনের সদস্য বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি, যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দৃঢ় হয় এবং মানুষের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে গণপিটুনী ও মব সহিংসতা, রাজনৈতিক উত্তেজনা, এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ-এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। তাই “এইচআরএসএস” সরকারের প্রতি মানবাধিকার রক্ষায় আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছে এবং একই সাথে সকল নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতি অধিক সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানাচ্ছে।
Reports Files
-
HR Report (May-2026) - English
