Monthly Report
Monthly Human Rights Situation Report April 2026
বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি প্রতিবেদন (এপ্রিল-২০২৬)
এপ্রিল ২০২৬ মাসে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি একটি সংবেদনশীল ও পরিবর্তনশীল পর্যায় অতিক্রম করেছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা, জাতীয় সংসদকে ঘিরে বিতর্ক এবং জননিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে সার্বিক পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করেছে। মাসজুড়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ও সহিংস ঘটনার ধারাবাহিকতা বিশেষভাবে লক্ষ্য করা গেছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মতামত প্রকাশকে কেন্দ্র করে গ্রেফতার, হয়রানি ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আইন প্রয়োগের অস্পষ্টতা নাগরিকদের মধ্যে ভীতি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রবণতা বাড়িয়ে তুলছে, যা একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য অশনিসংকেত।
শিক্ষা খাতে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ, সহিংসতা এবং দলীয় প্রভাব শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশকে ব্যাহত করেছে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ধর্মীয় সহনশীলতা ও সামাজিক সম্প্রীতির ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি পরিলক্ষিত হয়েছে। কুষ্টিয়ায় মাজারে হামলা এবং কথিত এক পীরকে হত্যার ঘটনা জননিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশে বাধা প্রদান এবং শান্তিপূর্ণ জমায়েতে প্রতিবন্ধকতা নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকারের পরিসর সংকুচিত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
সীমান্ত পরিস্থিতিতেও উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হামলায় বাংলাদেশি নিহত হওয়া এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনায় বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
শ্রম খাতে ন্যায্য মজুরি ও উন্নত কর্মপরিবেশের দাবিতে আন্দোলনের প্রেক্ষিতে শ্রমিকদের ওপর বলপ্রয়োগ, গ্রেফতার ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। এ ধরনের ঘটনা শ্রম অধিকার ও সংগঠনের স্বাধীনতার প্রতি হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এছাড়া, গণপিটুনীর ঘটনা এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা জননিরাপত্তা ও আইনের শাসনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে। সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হয়রানি ও পেশাগত কাজে বাধা প্রদানের ঘটনাগুলো সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতার ধারাবাহিকতা সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে।
বাংলাদেশের ১৬ টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এর সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে নিন্মোক্ত তথ্য উঠে এসেছে:
রাজনৈতিক সহিংসতা
এপ্রিল মাসে কমপক্ষে ৯৮ টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ০৬ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৫৩৩ জন। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ ও হামলা, দলীয় ও অন্তকোন্দল, ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর পৃথক হামলা, গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা এবং দেশব্যাপী ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এপ্রিল মাসে রাজনৈতিক সহিংসতা ও নিহতের সংখ্যা মার্চ মাসের তুলনায় কমেছে। গত মার্চ মাসে ১১৩ টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৮ জন এবং আহত হয়েছেন ৯১২ জন।
এপ্রিল মাসে সহিংসতার অন্তত ৯৮ টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ৪০ টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ২৪৭ জন ও নিহত ০৪ জন। ১২ টি বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১১৩ জন, ১৩ টি বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৫৮ জন । ০৩ টি বিএনপি-এনসিপি মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ২৬ জন, ২১ টি বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষে আহত ৪৬ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টি অন্তকোন্দলে ১টি ঘটনায় ২০ জন আহত হয়েছেন। বিভিন্ন দলের মধ্যে ৬ টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ২৩ জন । এছাড়া, ০২ টি ঘটনায় ইউপিডিএফ এর ২ জন সদস্য নিহত হয়েছেন।
এসব ঘটনার মধ্যে ক্যাম্পাস কেন্দ্রীক ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষের ১৫ টি ঘটনায় আহত হয়েছে ৭৭জন। এর মধ্যে ছাত্রদলের অন্তর্কোন্দলে ৩টি ঘটনায় ১৬ জন, ছাত্রদল-শিবির ৫টি ঘটনায় ৫৮ জন, ছাত্রদল, অন্যান্য ছাত্র সংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬টি ঘটনায় ১৭ জন আহত হয়েছে।
|
ক্রম |
রাজনৈতিক দলসমূহ |
ঘটনা |
আহত |
নিহত |
|
১ |
বিএনপি- বিএনপি |
৪০ |
২৪৭ |
৪ |
|
২ |
বিএনপি-জামায়াত |
১২ |
১১৩ |
|
|
৩ |
বিএনপি-আওয়ামী লীগ |
১৩ |
৫৮ |
|
|
৪ |
বিএনপি-এনসিপি |
৩ |
২৬ |
|
|
৫ |
এনসিপি-এনসিপি |
১ |
২০ |
|
|
৬ |
বিএনপি-অন্যান্য দল |
২১ |
৪৬ |
|
|
৭ |
অন্যান্য দলের মধ্যে |
৬ |
২৩ |
|
|
৮ |
ইউপিডিএফ- অন্যান্য দল |
২ |
|
২ |
|
মোট |
৯৮ |
৫৩৩ |
৬ |
|
এর পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ১৩ টি ঘটনায় কমপক্ষে ৩২ জন আহত এবং ৬ নিহত হযেছেন । যাদের মধ্যে বিএনপির ০৩ জন, আওয়ামীলীগের ০২ জন, জামায়াতের ০১ জন । ৩৭ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এছাড়াও সারাদেশে আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রীক ২৬ টি ঘটনায় অন্তত ৬৭ টি বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠা, দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
সভা-সমাবেশে বাঁধা
এ মাসে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপের একাধিক ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উক্ত সময়ে অন্তত ৭ টি সভা ও সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা প্রদান করে, যার ফলে নির্ধারিত কর্মসূচি স্থগিত, ছত্রভঙ্গ অথবা বাতিল করতে বাধ্য হন আয়োজকরা। এই ধরনের হস্তক্ষেপের ফলে সংঘর্ষ ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং অন্তত ৪৯ জন আহত ও ২ জনকে আটক করা হয়েছে, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ পথচারীও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানী
এটি উদ্বেগজনক যে, এ মাসে অন্তত ৪০ টি নির্যাতনের ঘটনায় কমপক্ষে ৭৫ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সকল ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্ততপক্ষে ৪২ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ১৭ জন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ১০ জন সাংবাদিক। ৩ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। এছাড়া ৪ টি মামলায় ৫ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। গত ২৩ এপ্রিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো ফটোকার্ড ও দেয়াল লিখনকে কেন্দ্র করে ডাকসু নেতৃবৃন্দ/ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সৃষ্ট উত্তেজনার তথ্য সংগ্রহ ও পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় হেনস্থা ও মারধরের শিকার হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ অন্তত ১০ জন সাংবাদিক আহত হন।
মত প্রকাশের স্বাধীনতা
এ মাসে মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এমাসে অন্তত ১৪ টি ঘটনায় ২৩ জনকে আটক ও ৯ টি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় অন্তত ২৩ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সমালোচনা করে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ায় ১ জন, ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নেতাকর্মীদের সমালোচনায় ৫ জন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও কটুক্তির অভিযোগে ৫ জন এবং অন্যান্য ইস্যুতে ১২ জনকে আটক করা হয়েছে। অন্যদিকে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫-এর বিভিন্ন ধারার অধীনে পৃথক ৭ টি মামলায় ১৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া এসব ঘটনায় ১৮ জনকে আটক করা হয়েছে।
মব সহিংসতা ও গণপিটুনী
এ মাসে গণপিটুনী ও মব সহিংসতার কমপক্ষে ৪৪ টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ২২ জন এবং আহত হয়েছেন ৩৯ জন। গত ৫ এপ্রিল চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে চোর সন্দেহে সালিস বৈঠকে পিটুনীর অভিযোগে স্থানীয়দের পিটুনীতে দুই ভাই মোহাম্মদ আবছার (৪০) ও মোহাম্মদ রাসেলকে বেধড়ক মারধর করে । পরে গুরুতর আহত অবস্থায় দুজনকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসক মোহাম্মদ আবছারকে মৃত ঘোষণা করেন। গত ৬ এপ্রিল বাগেরহাটের মোল্লাহাটে ঘের থেকে মাছ চুরির দায়ে শুকুর (৪২) নামে এক যুবককে প্রথমে পানিতে পানিতে চুবিয়ে ধরে। পরে চিৎকারে এলাকাবাসী ছুটে আসে এবং উত্তেজিত জনতা শুকুরকে ব্যপক মারধর করে। মারধরেরের এক পর্যায়ে শুকুরের হাত-পা ভেঙে ভেঙে যায় এবং এদের মধ্যে থাকা কিছু দুষ্কৃতিকারী শুকুরের চোখ উপড়ে ফেলে।
অজ্ঞাত লাশ
এপ্রিল মাসে সারাদেশ নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থানে দুর্বৃত্তদের হাতে পরিকল্পিত বা অপরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ডের ৩৮টি ঘটনায় ৩৯টি অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে বস্তাবন্দি অবস্থায় ৫ টি, গলিত অবস্থায় ৫ টি, শরীরে একাধিক আঘাতসহ ৬ টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া গলা কেটে হত্যা ২টি, হাত-পা বাঁধা ১টি এবং পোড়া লাশ ১টি। এছাড়া এর বাইরে নানা ধরণের পরিস্থিতিতে আরও ১৯টি লাশ পাওয়া গেছে।
ধর্মীয় ও সংখ্যালঘু নির্যাতন
এটি উদ্বেগজনক যে, এ মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর কমপক্ষে ০৮ টি হামলার ঘটনায় ১৩ জন আহত হয়েছেন এবং ৩ টি মন্দির, ২ টি প্রতিমা ও ১ টি বসতবাড়ি হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। গত ৯ এপ্রিল চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার পোমরা ইউনিয়নের বুড়ির দোকান সংলগ্ন মগদ্বেশ্বরী মন্দিরে চুরি ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এসময় প্রতিমা ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে।
সীমান্তে হত্যা ও নির্যাতন
এপ্রিল মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ০৮ টি ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হামলায় নিহত হয়েছেন ০২ জন এবং আহত হয়েছেন ০২ জন, যাদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে হয়েছন ০৩ জন। এছাড়া ০৮ জনকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া ভারতীয় নাগরিক খাসিয়ার গুলিতে ২জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। গত ১ এপ্রিল সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের সীমান্তে দুপুর ১২টার দিকে সাদ্দামসহ চারজন সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। সেখানে খাসিয়া সম্প্রদায়ের লোকজন তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালালে ঘটনাস্থলেই সাদ্দাম নিহত হন। ৭ এপ্রিল লালমনিরহাটের পাটগ্রামের ধবলগুড়ি সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিক আলী হোসেন (৪৯) নিহত হয়েছেন। এছাড়া গত ১০ এপ্রিল একই উপজেলার কালাইরাগ (কাউয়ার টুক) সীমান্তের ওপারে ভারতীয় নাগরিক খাসিয়ার গুলিতে সালেহ আহমেদ জয়ধর (৩০) নামে এক বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।
অপরদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ২টি সহিংসতার ঘটনায় ১৮ জনকে আটক করা হয়েছে। অরাকান আর্মী কর্তৃক পুতে রাখা মাইন বিষ্ফোরণে গত ১০ এপ্রিল উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের বালুখালী সীমান্তে শূন্যরেখায় মো. সাদেক (২৫) এর বাম পায়ের গোড়ালি উড়ে যায় এবং গত ১৫ এপ্রিল উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের নাফ নদীর তীরবর্তী স্থানে থাইংখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ ইউনুছ (২৬) এ ডান পা ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
কারা হেফাজতে মৃত্যু
এ মাসে সারাদেশে কারাগারে কমপক্ষে ৫ জন আসামী মারা গিয়েছেন। এর মধ্যে ২জন জন কয়েদী ও ৩ জন হাজতী। গত ১৪ এপ্রিল দিবাগত রাতে জামালপুরে কারাগারে বন্দী অবস্থায় জেলা আওয়ামীলীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য জিয়াউল হক চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা একটি মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকেই তিনি জামালপুর জেলা কারাগারে ছিলেন।
শ্রমিক নির্যাতন
এপ্রিল মাসে অন্তত ৮০ টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৩ জন, আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১১৬ জন এবং গ্রেফতার করা হয়েছে ২ জনকে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় অন্তত ৬৪ জন শ্রমিক তাদের কর্মক্ষেত্রে মারা গেছেন। এছাড়া পৃথক দুইটি ঘটনায় ২জন গৃহকর্মীকে নির্যাতনে ঘটনা ঘটেছে। গত ১০ এপ্রিল রাজধানীর বনানীতে একটি বাড়ির নিচে পড়ে থাকা ‘আমাকে বাঁচান’ লেখা চিরকুট কেন্দ্রীক এলাকায় উত্তেজনায় ছড়িয়ে পড়ে। পরে স্থানীয়রা উত্তেজিত হয়ে সে বাড়িতে ইট-পাটকেল ছুড়লে পরে পুলিশ গিয়ে শিউলি বেগম (২৫) নামে এক গ্রহকর্মীকে উদ্ধার করে। এ ঘটনায় গৃহকর্ত্রী সামেনা আলমকে আটক করা হয়েছে। অপরদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার উত্তর মৌড়াইল এলাকায় চিকিৎসক দম্পতি কে. এম. আব্দুল্লাহ আল নোমান ও কিমিয়া সাদাত তোফা কর্তৃক আয়েশা আক্তার (১০) নামে এক গৃহকর্মীকে নির্মমভাবে নির্যাতন করার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি গত ৩ মাস ধরে পরিবারের সাথে যোগাযোগও করতে দেওয়া হচ্ছিল না। পরে শিশুর পরিবার মামলা করে এবং পুলিশ অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে।
নারী ও শিশু নির্যাতন
এপ্রিল মাসে কমপক্ষে ২৯৪ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অন্তত ৬৮ জন, যাদের মধ্যে ৩০ (৪৪%) জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, ১৩ জন নারী ও কন্যা শিশু গণধর্ষনের শিকার হয়েছেন । অন্যদিকে ৭৯ জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন তন্মধ্যে শিশু ৪০ জন। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত ৮ জন, আহত হয়েছেন ২ জন নারী। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৬৪ জন, আহত হয়েছেন ৩৬ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ৩৬ জন নারী। এছাড়া, এসিড নিক্ষেপের ঘটনায় আহত হয়েছেন ১ জন।
গত ২ এপ্রিল ভোলার দৌলতখানায় দোকানে যাওয়ার পথে মাটিকাটার দুই শ্রমিক কতৃক ১২ বছর বয়সি এক শিশু গনধর্ষনের শিকার হয়। গত ১০ এপ্রিল কুমিল্লার মুরাদনগরে ৮ বছর বয়সী এক শিশু ধর্ষনের শিকার হয়। প্রতিবাদ করতে গেলে ধর্ষিতার মামার পায়ের রগ কেটে ফেলার ঘটনা ঘটে। গত ৯ এপ্রিল নাটোরের বড়াইগ্রামে বাজার থেকে ফেরার পথে এক স্কুলছাত্রীকে (১৪) জোরপূর্বক ধর্ষন চেষ্টা করলে বাড়ি ফিরে লজ্জায় বিষপানে আত্নহত্যার চেষ্টা করে। গত ১৩ এপ্রিল টাঙ্গাইলে স্বামীকে মাদকের টাকা দিতে অস্বীকার করলে ঝগড়ার একপর্যায়ে কেরোসিন তেল দিয়ে আগুন ধরিয়ে স্ত্রী নাজমা হরিজনকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। গত ২ এপ্রিল যশোরের অভয়নগরে স্বামীকে তালাক দিতে অস্বীকৃতি জানালে ক্ষোভে মাসুরা বেগমকে (১৯) ঘুমের ওষুধ মিশ্রিত কোমল পানীয় পান করিয়ে অচেতন অবস্থায় তার পায়ে ও যৌনাঙ্গে অ্যাসিড নিক্ষেপ করে। নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।
অন্যদিকে, এটি উদ্বেগজনক যে, ১৯১ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যাদের মধ্যে ৫৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১৩৪ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
মামলা ও গ্রেফতার
এ মাসে সংঘটিত বিভিন্ন সহিংসতা ও রাজনৈতিক ঘটনায় কমপক্ষে ২৩ টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় ৩৮৬ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও প্রায় ১২৫০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এছাড়া, একই মাসে রাজনৈতিক ও অন্যান্য মিলিয়ে মোট ১৮১টি ঘটনায় অন্তত ২৮২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের অন্তত ১৭৪ জন, বিএনপির ৮৪ জন, এবং জামায়াতে ইসলামির ১৯ জন সদস্য রয়েছেন বলে জানা গেছে। একই সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সারাদেশে যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়। এসব অভিযানে ১,০৮৯ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের একটি বড় অংশ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন উগ্রপন্থী সংগঠনের সদস্য বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি, যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দৃঢ় হয় এবং মানুষের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে গণপিটুনী ও মব সহিংসতা, রাজনৈতিক উত্তেজনা, এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ-এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। তাই “এইচআরএসএস” সরকারের প্রতি মানবাধিকার রক্ষায় আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছে এবং একই সাথে সকল নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতি অধিক সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানাচ্ছে।
Reports Files
-
HR Report (April-2026) - English
