Monthly Report
Monthly Human Rights Situation Report February 2026
বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি প্রতিবেদন (ফেব্রুয়ারি-২০২৬)
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাস বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যয় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের পর যে গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রক্রিয়া শুরু হয়, তার ধারাবাহিকতায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করার প্রত্যাশা তৈরি করেছে। কিন্তু নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেশজুড়ে সংঘটিত রাজনৈতিক সহিংসতা, নির্বাচনী সংঘাত এবং বহুমাত্রিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সেই প্রত্যাশাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ছিল উত্তপ্ত ও অস্থির। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মেরুকরণ, ক্ষমতার প্রতিযোগিতা, আধিপত্য বিস্তার এবং প্রতিশোধপরায়ণতার প্রবণতা বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার জন্ম দিয়েছে। প্রচারণাকালীন হামলা, প্রতিপক্ষকে হত্যা ও আহত করা, নির্বাচনী কার্যালয় ও সম্পত্তিতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, নির্বাচন-পরবর্তী প্রতিশোধমূলক আক্রমণ—এসব ঘটনা সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের প্রতি আস্থাকে দুর্বল করেছে। একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারের ক্ষেত্রেও হস্তক্ষেপ লক্ষ্য করা গেছে। এ সময় নারী প্রার্থী, ভোটার ও সাধারণ নারীদের ওপর শারীরিক, মানসিক ও ডিজিটাল নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে এক উদ্বেগজনক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে গণপিটুনি, ন্যায্য দাবিদাওয়া আদায়ে বাধা প্রদানের ঘটনা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা এবং বিচারহীনতার দীর্ঘ সূত্রিতা জনমনে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসানের পর মানুষের মধ্যে যে আশা-আকাঙ্ক্ষার জন্ম নিয়েছিল- স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, সমতা ও মানবাধিকারের প্রতিষ্ঠা ফেব্রুয়ারি মাসের ঘটনাপ্রবাহ সেই আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে এক ধরনের সাংঘর্ষিক বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরেছে। সার্বিক পরিস্থিতি ইঙ্গিত করে যে, দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রক্রিয়া এখনও চ্যালেঞ্জপূর্ণ ও নাজুক অবস্থায় রয়েছে।
বাংলাদেশের ১৬ টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এর সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে নিন্মোক্ত তথ্য উঠে এসেছে।
রাজনৈতিক সহিংসতা
ফেব্রুয়ারি মাসে কমপক্ষে ৩৪৬ টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৯৩৩ জন। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতা, বিভিন্ন দলের সমাবেশ কেন্দ্রিক সহিংসতা, প্রার্থীর সমর্থকের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা, বাড়ি-ঘর, যানবাহন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ও রাজনৈতিক দলের কার্যালয় ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। ফেব্রুয়ারি মাসে রাজনৈতিক সহিংসতা ও নিহতের সংখ্যা জানুয়ারির মাসের তুলনায় বেড়েছে । গত জানুয়ারির মাসে ১৫১ টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন ০৮ জন এবং আহত হয়েছিলেন ১২৩৩ জন।
ফেব্রুয়ারি মাসে সহিংসতার ৩৪৬টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ৯৫টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৫৯৯ জন ও নিহত ০৮ জন। ১৯১ টি বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৯৯৮ জন ও নিহত ০১ জন, ০৯ টি বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ২৭ জন এবং নিহত হয়েছেন ১জন। ১৪ টি বিএনপি-এনসিপি মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৩৮ জন, আওয়ামীলীগ-এনসিপির মধ্যে ৩টি সংঘর্ষের ঘটনায় আহত ৫১জন, ২৮ টি বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৮১ জন । এছাড়া, বিভিন্ন দলের মধ্যে ১১ টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৪২ জন । নিহত ১০ জনের মধ্যে বিএনপির ০৮ জন ও জামায়াতের ০১ জন ও আওয়ামীলীগের ১জন। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ফলে দলটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। তবে নির্বাচন শেষ হওয়ার পরপরই ঢাকাসহ অন্তত ৩০ টি জেলা ও উপজেলায় দলটির নেতাকর্মীরা কার্যালয়ে প্রবেশের চেষ্টা করছেন বা কোথাও কোথাও অবস্থানও নিয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। আবার বেশ কিছু স্থানে কার্যালয় খোলার পর পাল্টা দখল, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।
নির্বাচনী সহিংসতা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন দল এবং দলের মনোনীত প্রার্থী ও বঞ্চিত প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়ে এ হামলা, ভাঙচুর অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে বিজয়ী প্রার্থীর কর্মী-সমর্থক কর্তৃক পরাজিত প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকের বাড়ি-ঘর, যানবাহন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা চলমান রয়েছে যা খুবই উদ্বেগজনক। ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচনকেন্দ্রীক অন্তত ২৮৫ টি সহিংসতার ঘটনায় আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৫৫৫ জন এবং নিহত হয়েছেন ০৫ জন। নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৪৫০টির বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ও নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচনী সহিংসতার কমপক্ষে ২৮৫ টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ৭৩ টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৪৬৫ জন ও নিহত ০৩ জন। ১৮২ টি বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন অন্তত ৯০২ জন ও নিহত ০১ জন, ০৩ টি বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ০৩ জন এবং নিহত হয়েছে ০১ জন, ১১ টি বিএনপি-এনসিপি মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১১১ জন। এছাড়া ১১ টি বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৪২ জন। এছাড়া, বিভিন্ন দলের মধ্যে ০৬ টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩৩ জন। নিহত ০৫ জনের মধ্যে বিএনপির ০৩ জন, আওয়ামীলীগের ০১ জন ও জামায়াতের ০১ জন। নির্বাচন ও নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের অন্তর্কোন্দলে নিহত ৫ জনের মধ্যে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার চরাঞ্চলে বিএনপির সমর্থক জসিম উদ্দিন (৩০), গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের বিএনপি কর্মীর ছেলে ইমন (১২), এবং বাগেরহাটের কচুয়ায় বিএনপির সমর্থক ওসমান সর্দার (২৯) নিহত হন। এছাড়া বিএনপি-আওয়ামীলীগের সংঘর্ষের ঘটনায় গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ভোলার চরফ্যাশানে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় আব্দুর রহিম (৪৫) নামে আওয়ামীলীগের এক সমর্থককে কুপিয়ে হত্যা করে স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীরা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার হাসাদহ বাজারে নির্বাচন পরবর্তী সহিসংতায় বাঁকা ইউনিয়ন জামায়াত আমীরের ছোট ভাই হাফিজুর রহমান (২৫) স্থানীয় বিএনপির নেতা-কর্মীদের সাথে সংঘর্ষে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত হন।
এদিকে, গত ১৩ ফেব্রুয়ারি নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার চানন্দী ইউনিয়নে ‘শাপলা কলি’ প্রতীকে ভোট দেওয়াকে কেন্দ্র করে এক তিন সন্তানের জননীকে (৩২) নিজ ঘরে ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী নলেরচর এলাকার একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা। অভিযোগে বলা হয়, হামলাকারীরা ঘরে ভাঙচুর করে তাকে টেনে বের করে মারধর করে এবং ভোট দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে কটূক্তি করে। মারধরের ফলে তিনি গুরুতর আহত হয়ে স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারছেন না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্তরা আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সরকার পরিবর্তনের পর বিএনপির পরিচয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছে।
সভা-সমাবেশে বাঁধা
এ মাসে মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপের একাধিক ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উক্ত সময়ে অন্তত ৬টি সভা ও সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা প্রদান করে, যার ফলে নির্ধারিত কর্মসূচি স্থগিত, ছত্রভঙ্গ অথবা বাতিল করতে বাধ্য হন আয়োজকরা। এই ধরনের হস্তক্ষেপের ফলে সংঘর্ষ ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং অন্তত ৯২ জন ব্যক্তি আহত হন, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ পথচারীও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে।
সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানী
এটি উদ্বেগজনক যে, এ মাসে অন্তত ২৮ টি হামলার ঘটনায় কমপক্ষে ৬৩ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সকল ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্ততপক্ষে ৫৫ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ১ জন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ০৪ জন সাংবাদিক । এছাড়াও ১ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংবাদ সংগ্রহের সময় নোয়াখালীর হাতিয়ায় ভোট কেন্দ্রে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসীদের হামলায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতে বিটিভির সাংবাদিক মিরাজ উদ্দিনকে কুপিয়ে আহত করা হয়। তাঁর সঙ্গে থাকা বাইক চালক সাকিবও আহত হন। তারা উভয়েই বর্তমানে চিকিৎসাধীন। এছাড়া গত ১৯ ফেব্রুয়ারি এখন টিভির চার সাংবাদিককে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে মতামত প্রকাশের জেরে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান এবং সাত দিনের জন্য কর্মবিরতিতে যেতে বাধ্য করার ঘটনা ঘটেছে।
মব সহিংসতা ও গণপিটুনী
এ মাসে গণপিটুনী ও মব সহিংসতার কমপক্ষে ৪২ টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১৯ জন এবং আহত হয়েছেন ৩০ জন। গত ২০ ফেব্রুয়ারি গাইবান্ধার সাদুল্লাহপুরের ইদিলপুর ইউনিয়নের মোজাহি পুর গ্রামে ছিনতাইকারী সন্দেহে লেবু মিয়া ওরফে ভন্ডল (২৪) ও মঈনুল ইসলাম (৫০) স্থানীয়দের গণপিটুনিতে দুইজন নিহত হয়েছেন।
ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন
এটি উদ্বেগজনক যে, এ মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর কমপক্ষে ১৪ টি হামলার ঘটনায় ১৫ জন আহত হয়েছেন, এবং ৩ টি মন্দির, ১ টি প্রতিমা ও ১১ টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে । এছাড়াও জমি দখলের মত ১ টি ঘটনা ঘটেছে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে নারায়ণগঞ্জের রুপগঞ্জের গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের সাওঘাট পশ্চিম মনিপাড়া এলাকায় অবস্থিত শ্রীশ্রী রক্ষাকালী মন্দিনে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসময় ৮-১০জন দূর্বৃত্ত লোহার পাইপ, লাঠিসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করে সরস্বতী প্রতিমা, চেয়ার, রান্নার পাতিল, বৈদ্যুতিক তার ও লাইটসহ বিভিন্ন সামগ্রী ভাঙচুর করে। এমনকি কেরোসিন বা মবিল জাতীয় দাহ্য পদার্থ ঢেলে মন্দিরে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
সীমান্তে হত্যা ও নির্যাতন
ফেব্রুয়ারি মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৩ টি হামলার ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হামলায় আহত হয়েছেন ০৬ জন। এছাড়া ৯ জনকে আটক করা হয়েছে। অপরদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ২টি সহিংসতার ঘটনায় ৫ জনকে আটক করা হয়েছে। গত ৮ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজারের টেকনাফে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে মিয়ানমারের দিক থেকে আরাকান আর্মির ছোড়া গুলিতে গুরুতর আহত শিশু হুজাইফা আফনান (৯) ২৭দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। এর আগে গত ১১ জানুয়ারি সকালে টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় মিয়ানমারের ওপার থেকে আসা গুলি মাথায় বিদ্ধ হয়ে আহত হয় স্থানীয় বাসিন্দা জসিম উদ্দিনের মেয়ে হুজাইফা আফনান।
বিচার বহির্ভূত হত্যা (হেফাজতে/নির্যাতনে/গুলি/বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যু
দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, ভিকটিমের পরিবার ও এইচআরএসএস এর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, এ মাসে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতনে ১জন এবং বন্দুকযুদ্ধে ১জন নিহত হয়েছেন। গত ১০ ফেব্রুয়ারি মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলায় সেনা হেফাজতে রাসেল কাজী (৩৫) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। নিহতের পরিবার ও স্বজনদের দাবি শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে তাকে হত্যা করা হয়েছে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বান্দরবানের বোয়াংছড়ি উপজেলার মুরুং বাজার এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠী জেএসএসের গোলাগুলির ঘটনায় জেএসএসের এক সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া গত ৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বনানীতে পুলিশের প্যাট্রল টিম টহলের সময় আতঙ্কিত হয়ে গুলশান ঝিলে ঝাঁপ দিয়ে মাহা আলম (১৬) নামে এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনে কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার আগানগর ইউনিয়নের আগানগর দক্ষিণপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তাড়া খেয়ে রাজ্জাক মিয়া নামে একজন মারা গেছেন।
কারা হেফাজতে মৃত্যু
এ মাসে সারাদেশে কারাগারে কমপক্ষে ১২ জন আসামী মারা গিয়েছেন । ১২ জনের মধ্যে ১০ জন কয়েদী ও ০২ জন হাজতি। এর মধ্যে ৪ জন আওয়ামীলীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের এবং ৮ জন্য সাধারণ কয়েদী মারা গেছেন। গত ৭ ফেব্রুয়ারি সকালে কারাবরণ অবস্থায় অসুস্থ হয়ে পড়লে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন নেওয়া হয়, সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। তিনি ২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট আটকের পর থেকে ৩টি মামলায় দিনাজপুর জেলা কারাগারে বন্দি ছিলেন। রমেশ চন্দ্র সেন আওয়ামীলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ঠাকুরগাঁও-১ (সদর উপজেলা) আসন থেকে ৫ বারের নির্বাচিত সংসদ্য ছিলেন।
শ্রমিক নির্যাতন
ফেব্রুয়ারি মাসে ৩৩ টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ০৫ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১২৩ জন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় ২০ জন শ্রমিক তাদের কর্মক্ষেত্রে মারা গেছেন। এছাড়া ১ জন গৃহপরিচালিকা নিহত ও ১ জন আহত হয়েছে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় বিজিবি সদর দপ্তরের অফিসার্স কোয়ার্টারের একটি বাসা থেকে বিবি হালিমা নামের ১১ বছর বয়সী এক শিশু গৃহকর্মীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
নারী ও শিশু নির্যাতন
ফেব্রুয়ারি মাসে কমপক্ষে ২৩৬ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অন্তত ৪৫ জন, যাদের মধ্যে ২৪ জন (৫২%) ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, ১০ জন নারী ও কন্যা শিশু গণধর্ষনের শিকার হয়েছেন এবং ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়েছে ৩ জনকে। ৯০ জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন তন্মধ্যে শিশু ১১ জন। এছাড়া, যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত ১ আহত হয়েছেন ২ জন নারী । পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৫১ জন, আহত হয়েছেন ৪৬ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ৪৪ জন নারী। এছাড়া এসিড সহিংসতায় নিহত হয়েছেন এক নারী। অন্যদিকে, এটি উদ্বেগজনক যে, ৯৫ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যাদের মধ্যে ৪৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৫১ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর মাধবদীতে আমেনা আক্তার (১৫) নামে এক কিশোরীকে গণধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এমনকি স্থানীয় ৫-৬জন মিলে তার বাবার কাছ থেকে আমেনাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে মহিষাশুরা ইউনিয়নের দাউদকান্দি এলাকার একটি সরিষা ক্ষেতে তার লাশ পাওয়া যায়। ২৮ ফেব্রুয়ারি পাবনার ঈশ্বরদীতে মধ্যরাতে বাড়িতে ঢুকে দাদি সুফিয়া বেগমকে হত্যা করে কিশোরী নাতনি জমিলা আক্তারকে (১৫) গনধর্ষন করে হত্যা করার ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের ধারণা, কিশোরীকে অপহরণে বাধা দেওয়ায় প্রথমে দাদিকে এবং ধর্ষণের পর নাতনিকে হত্যা করা হয়েছে।
মামলা ও গ্রেফতার
এ মাসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মী এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ধারায় কমপক্ষে ৩০ টি মামলা হয়েছে। এ সকল মামলায় ৪৯৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ১৪৭৮৭ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামী করা হয়েছে। এ মাসে রাজনৈতিক মামলায় কমপক্ষে ৩৩৮ আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যেখানে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মী অন্তত ৯৮ জন, বিএনপির নেতাকর্মী ১৮১ জন এবং জামায়াতের ৫০ জন । এছাড়া এই সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সারাদেশে যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়। এসব অভিযানে প্রায় ৩ হাজার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মী।
দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি, যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দৃঢ় হয় এবং মানুষের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচনী সহিংসতা, মব সহিংসতা, হেফাজতে মৃত্যু, রাজনৈতিক উত্তেজনা, এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ-এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। তাই “এইচআরএসএস” সরকারের প্রতি মানবাধিকার রক্ষায় আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছে এবং একই সাথে সকল নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতি অধিক সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানাচ্ছে।
Reports Files
-
HR Report (February-2026) - English
