Menu

Special Report

Special Human Rights Situation Report (March-August'26)

 

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি (মার্চ-আগস্ট, ২০২৬)

‘এইচআরএসএস’ এর মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন

মার্চ থেকে আগস্ট ২০২৬—এই ছয় মাসে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি রাজনৈতিক পরিবর্তন-পরবর্তী নতুন বাস্তবতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, নাগরিক নিরাপত্তাহীনতা এবং মৌলিক অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-পরবর্তী সময়ে নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের কার্যকরীকরণ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং জবাবদিহিতামূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার যে প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়েছিল, পর্যবেক্ষণাধীন সময়ে তার পাশাপাশি বেশ কিছু উদ্বেগজনক প্রবণতাও পরিলক্ষিত হয়েছে।

 

এই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, দলীয় অন্তর্কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা এবং বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা জনজীবন, নাগরিক নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক সামাজিক পরিবেশকে ব্যাহত করেছে। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ, মতপ্রকাশ এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা প্রদানের অভিযোগ নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ, সংগঠন ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অধিকার বাস্তবায়ন নিয়েও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

 

ছয় মাসের পর্যবেক্ষণে আইনের শাসন ও জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হিসেবে মব সহিংসতা, গণপিটুনি, হত্যাকাণ্ড, অপহরণ, চাঁদাবাজি, অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার, মাজারে হামলা এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা ক্রমাগতভাবে সামনে এসেছে। গুজব, উসকানি, সামাজিক বিরোধ, স্থানীয় আধিপত্য ও রাজনৈতিক প্রভাবকে কেন্দ্র করে সংঘটিত বিভিন্ন সহিংসতা রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগ ও বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকটকে প্রতিফলিত করেছে। বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে প্রাণহানি, হেফাজতে ও কারাগারে মৃত্যু এবং ব্যাপক গ্রেপ্তার ও মামলা দায়েরের ঘটনাও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে নাগরিক অধিকার যাতে অযথা সীমিত না হয় এবং অপরাধ দমনের প্রতিটি পদক্ষেপ যাতে আইনি, স্বচ্ছ ও মানবাধিকারসম্মত পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়-এ বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।

 

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও ছয় মাসে ধারাবাহিক উদ্বেগ লক্ষ্য করা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত প্রকাশ, রাষ্ট্র ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সমালোচনা, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিষয়ে মন্তব্য এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কারণে মামলা, গ্রেপ্তার, হয়রানি, হুমকি ও চাপ প্রয়োগের অভিযোগ নাগরিকদের মধ্যে ভীতি এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রবণতা সৃষ্টি করেছে। সাংবাদিকদের ওপর হামলা, লাঞ্ছনা, আটক, হুমকি এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা প্রদানের ঘটনাগুলো স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশকে আরও সংকুচিত করার আশঙ্কা তৈরি করেছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভিন্নমত, সমালোচনা ও স্বাধীন সংবাদ পরিবেশের সুরক্ষা অপরিহার্য; ফলে ডিজিটাল ও প্রচলিত উভয় মাধ্যমে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্পষ্টতা, প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি।

 

নারী ও শিশুদের মানবাধিকার পরিস্থিতি এই ছয় মাসেও গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে ছিল। ধর্ষণ, গণধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুকজনিত নির্যাতন, নারী হত্যা, শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা দেশের বিভিন্ন স্থানে অব্যাহত রয়েছে। এসব ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার সংকট নয়; বরং নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং বিচারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যবস্থার বিদ্যমান দুর্বলতাকেও প্রকাশ করে। ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা, চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও আইনি সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপরাধীদের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও ন্যায়সংগত বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন।

 

শ্রম অধিকার ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতির ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়েছে। ন্যায্য মজুরি ও শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার, হয়রানি ও বলপ্রয়োগের অভিযোগের পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা, শ্রমিকের মৃত্যু এবং গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাও সামনে এসেছে। এসব ঘটনা শ্রমিকদের সংগঠনের স্বাধীনতা, ন্যায্য অধিকার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাকে তুলে ধরেছে।

 

সীমান্ত পরিস্থিতিও এই ছয় মাসে মানবাধিকার উদ্বেগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে অব্যাহত ছিল। সীমান্তে গুলিবর্ষণ, বাংলাদেশি নাগরিক নিহত ও আহত হওয়া, নির্যাতন, আটক, পুশইন এবং স্থলমাইন বা বিস্ফোরণে হতাহতের ঘটনা সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর জীবন ও নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। সীমান্তে বেসামরিক নাগরিকের প্রাণহানি ও নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে তদন্তের পাশাপাশি কূটনৈতিক পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ এবং সীমান্তবর্তী মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।

 

শিক্ষা ও সামাজিক সম্প্রীতির ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য উদ্বেগ দেখা গেছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে রাজনৈতিক প্রভাব, দলীয় বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, বহিরাগতদের উপস্থিতি ও ছাত্রসংগঠনগুলোর সংঘর্ষ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশকে ব্যাহত করেছে। একই সময়ে মাজারে হামলা, ধর্মীয় অনুভূতিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা এবং বিভিন্ন স্থানে শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনা ধর্মীয় সহনশীলতা, সামাজিক সম্প্রীতি ও নাগরিক স্বাধীনতার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক সহিংসতা ও দখলদারিত্বের বাইরে রেখে নিরাপদ, মুক্ত ও সহনশীল শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

 

জনস্বাস্থ্য ও জননিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ছয় মাসে একাধিক গুরুতর সংকট সামনে এসেছে। হামের প্রাদুর্ভাবে বিপুলসংখ্যক শিশুর মৃত্যু, টিকাদান ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধতা এবং স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা ও প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে ঘরমুখো মানুষের যাত্রায় সড়ক ও নৌপথে ব্যাপক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি, পরিবহন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের ঘাটতিও জননিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুতর সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করেছে। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বাজারে অস্থিরতা, জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্যসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা এবং পরিবহন ব্যয়ের বৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনযাত্রায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। ফলে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকারও মানবাধিকার আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

 

বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিও এ সময় বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বিভিন্ন দেশে অগ্নিকাণ্ড এবং অনিয়মিত অভিবাসনপথে বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনা নিরাপদ অভিবাসন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের সুরক্ষা এবং মানবপাচার প্রতিরোধে আরও কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।

এছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জারিকৃত বিভিন্ন অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ এবং নতুন সরকারের সেগুলোর কয়েকটি অনুমোদন না করার সিদ্ধান্ত মানবাধিকার ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ধারাবাহিকতা নিয়ে আলোচনার সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে গণভোট, বিচারক নিয়োগ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বতন্ত্র সচিবালয়, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত আইনগত উদ্যোগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জনসম্পৃক্ততা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বিবেচনা করা প্রয়োজন। মানবাধিকার রক্ষায় গঠিত প্রতিষ্ঠান ও আইনি কাঠামো যেন রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে দুর্বল না হয়ে পড়ে, বরং আরও স্বাধীন, কার্যকর ও জবাবদিহিতামূলক হয়-এটি রাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

 

সামগ্রিকভাবে মার্চ–আগস্ট ২০২৬-এর ছয় মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের সামনে একই সঙ্গে দুটি বাস্তবতা বিদ্যমান-একদিকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও মানবাধিকার সুরক্ষা শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব সংস্কৃতি, নাগরিক নিরাপত্তাহীনতা, মতপ্রকাশের ওপর চাপ, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, শ্রম অধিকার লঙ্ঘন, সীমান্তে প্রাণহানি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহিতার ঘাটতি সেই অগ্রযাত্রাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত আইনের শাসন ও সাংবিধানিক অধিকার সমুন্নত রাখা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিটি অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে জবাবদিহিতার আওতায় আনা, ভুক্তভোগীদের কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা। একই সঙ্গে মতপ্রকাশ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠনের অধিকার, নারী-শিশু ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, শ্রমিকদের অধিকার এবং নিরাপদ জীবনযাপনের অধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন। গণতান্ত্রিক সরকারের বৈধতা কেবল নির্বাচনী ম্যান্ডেটের ওপর নির্ভর করে না; নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা, মর্যাদা ও অধিকার কতটা কার্যকরভাবে সুরক্ষিত হচ্ছে—তার ওপরও সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা নির্ভরশীল। অতএব আগামী সময়ে মানবাধিকার, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা ও সামাজিক সম্প্রীতিকে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রীয় নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) ২০২৬ সালের মার্চ–আগস্ট ছয় মাস সময়কালের সারাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে এই বিশেষ পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। বাংলাদেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, এইচআরএসএস-এর নিজস্ব তথ্যসংগ্রহ, মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ এবং নথিভুক্ত ঘটনার বিশ্লেষণের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির প্রধান প্রবণতা, চ্যালেঞ্জ ও উদ্বেগের ক্ষেত্রসমূহ মূল্যায়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৫ সালের একই সময়ের তথ্যের সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এক বছরের ব্যবধানে রাজনৈতিক সহিংসতা, আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিস্থিতির উন্নতি বা অবনতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

এইচআরএসএস আশা করে, প্রতিবেদনে উপস্থাপিত পর্যবেক্ষণ, পরিসংখ্যান, তুলনামূলক তথ্য ও সুপারিশসমূহ নীতিনির্ধারক, রাষ্ট্রীয় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, জাতীয় মানবাধিকার সংস্থা, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, উন্নয়ন সহযোগী ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের জন্য বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি মূল্যায়ন এবং মানবাধিকার সুরক্ষা ও প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এগিয়ে নিতে একটি কার্যকর ও তথ্যভিত্তিক রেফারেন্স হিসেবে ভূমিকা রাখবে।

নিম্নে ২০২৬ সালের মার্চ-আগস্ট মাস সময়কালে সংঘটিত বিভিন্ন মানবাধিকার পরিস্থিতির পরিসংখ্যান, প্রবণতা এবং বিষয়ভিত্তিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো:

 

 

রাজনৈতিক সহিংসতা

মার্চ থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত ছয় মাসে কমপক্ষে ৪৪৮ টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৫১ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২৭৮০ জন। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা, বিভিন্ন দলের সমাবেশ কেন্দ্রিক সহিংসতা, প্রার্থীর সমর্থকের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা, বাড়ি-ঘর, যানবাহন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ও রাজনৈতিক দলের কার্যালয় ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

গত ছয় মাসে সহিংসতার ৪৪৮ টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ১৫৮ টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১২০৮ জন ও নিহত ২৮ জন। ৭০ টি বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৫৮৪ জন ও নিহত ৯ জন, ৭৩ টি বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৪৪০ জন এবং নিহত হয়েছেন ০৭ জন। ২৩ টি বিএনপি-এনসিপির মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১১১ জন, ৮২ টি বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৭৫ জন। এছাড়া, বিভিন্ন দলের মধ্যে ৪২ টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ২৬২ জন এবং নিহত হয়েছেন ০৭ জন।

২০২৬ সালের (মার্চ- আগস্ট মাস) তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক সহিংসতায় ৪৪৮ টি ঘটনা ঘটেছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে ৪২৭ টি ছিল। অর্থাৎ, বছরের ব্যবধানে ৬ মাসে সহিংসতার ঘটনা ২১ টি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে মৃত্যুর সংখ্যা ৭৪ থেকে ৫১ জনে নেমে এসেছে, এবং আহতের সংখ্যা ৩৫৬২ থেকে ২৭৮০ জনে নেমেছে। এ পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, বছরের ব্যবধানে এ সময়ে সংঘর্ষের সংখ্যা ও ব্যাপ্তি বেড়েছে, কিন্তু হতাহতের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমেছে।

৪৪৮ টি সহিংসতার ঘটনার ৪০৬ (৯১%) টিই ঘটেছে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ও বিএনপির সাথে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে এবং এসকল সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ২৫১৮ (৯০%) জন এবং নিহত হয়েছেন ৪৪ (৮৬%) জন। নিহত ৫১ জনের মধ্যে বিএনপির ৩০ (৫৯%) জন, জামায়াতের ০৫ (১০%) জন ও আওয়ামীলীগের ৩ জন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক রাজনৈতিক দলের ৭ জন, অন্যান্য ০৩ জন, চরমপন্থী দলের সদস্য ১ জন এবং একজন নারীসহ সাধারন মানুষ ২ জন।

রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্র (মার্চ-আগস্ট: ২০২৬)

ক্রম

রাজনৈতিক দলসমূহ

সংঘর্ষের ঘটনা

আহত

নিহত

১

বিএনপি- বিএনপি

১৫৮

১২০৮

২৮

২

বিএনপি-জামায়াত

৭০

৫৮৪

৯

৩

বিএনপি-আওয়ামী লীগ

৭৩

৪৪০

৭

৪

বিএনপি-এনসিপি

২৩

১১১

০

৫

বিএনপি-অন্যান্য দল

৮২

১৭৫

০

৬

অন্যান্য দলের মধ্যে

৩৮

২৬২

 

৭

ইউপিডিএফ-অন্যান্য

৪

 

৭

মোট

৪৪৮

২৭৮০

৫১

এর পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ৫৪ টি ঘটনা ঘটেছে। এসকল হামলায় কমপক্ষে ৭৪ জন আহত এবং বিএনপির ১৭ জন, আওয়ামীলীগের ৭ জন, জামায়াতের ১ জন ও অন্যান্য দলের ৪ জনসহ মোট ২৯ জন নিহত হয়েছেন। এ সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় কমপক্ষে ১০৫ রাজনৈতিক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এছাড়াও সারাদেশে আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, নির্বাচনী সহিংসতা, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রীক অন্তত ১০৫ টি ঘটনায় ৪৬৬ এর অধিক বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠা, দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। 

নির্বাচনী সহিংসতা

২০২৬ সালের মার্চ-আগস্ট মাস পর্যন্ত সময়কালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সহিংসতা, সংঘর্ষ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌছায় যা পরবর্তীতে রাজনেতিক সহিংসতায় রুপ নিয়েছে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলসমূহের মনোনীত প্রার্থী, বিদ্রোহী (বঞ্চিত) প্রার্থী এবং তাদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা গেছে । বিশেষ করে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিজয়ী প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের দ্বারা পরাজিত প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের বাড়িঘর, যানবাহন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ব্যাপকভাবে ঘটেছে। এই প্রতিহিংসামূলক সহিংসতা স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, যা আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য গভীর হুমকি হিসেবে বিবেচিত। এছাড়া আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রার্থীতা ঘোষণা, প্রচার-প্রচারণা ও কার্যক্রম পরিচালনায় বাঁধা সৃষ্টি ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে, এতে তফসিল ঘোষণার পূর্বেই আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজনে সহিংসতার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, উল্লেখিত ছয় মাসে নির্বাচনকেন্দ্রিক অন্তত ১৪ টি সহিংসতার ঘটনায় কমপক্ষে ১৩৯ জন আহত হয়েছেন এবং নিহত হয়েছেন অন্তত ৪ জন। এছাড়া নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর, দলীয় অফিস, ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও ক্ষতিসাধনের ঘটনা ঘটেছে।

সহিংসতার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং পারস্পরিক সংঘর্ষ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ৮ ঘটনায় অন্তত ১২২ জন আহত এবং ২ জন নিহত হয়েছেন। তাছাড়া, বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে ৬ টি ঘটনায় অন্তত ১৭ জন আহত এবং ২ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের রাজনৈতিক পরিচয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ৪ জন নিহতের মধ্যে বিএনপির ২ জন ও জামায়াতের ২ জন।

সহিংসতার পৃথক ঘটনাগুলোর মধ্যে কয়েকটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নির্বাচনের পর গত ৫ মার্চ ২০২৬, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে মো. রুবেল মিয়া ও মো. সোহেল মিয়া নিহত হন। এছাড়া ১৮ মার্চ ২০২৬, পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় নীলগঞ্জ ইউনিয়নে মো. ইদ্রিস (৪৫) নামে এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে মারধর করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। আগস্ট ২০২৬ মাসে আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রার্থী ও তাঁদের কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলার ঘটনাও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। গত ৫ আগস্ট কুষ্টিয়ার খোকসা পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মেয়র প্রার্থী ও খোকসা উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাফিজ আহমেদ খান রাজুর ওপর সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। খোকসা থানাপাড়া এলাকায় নিজ বাড়ির গেটের সামনে সংঘটিত এ হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। হামলার সময় ব্যাপক গুলিবর্ষণ ও ককটেল বিস্ফোরণের ফলে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া, গত ১১ আগস্ট সাতক্ষীরার তালা উপজেলার নগরঘাটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী এবাদুল ইসলামের ওপর সশস্ত্র হামলার অভিযোগ পাওয়া যায়। হামলায় প্রার্থী এবাদুল ইসলামসহ অন্তত আটজন কর্মী-সমর্থক আহত হন।

 

 

সভা-সমাবেশে বাঁধা

চলতি বছরের (মার্চ-আগস্ট) ছয় মাসে মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপের বেশ কিছু ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উক্ত সময়ে অন্তত ৫৩ টি সভা ও সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা প্রদান করে, যার ফলে নির্ধারিত কর্মসূচি স্থগিত, ছত্রভঙ্গ অথবা বাতিল করতে বাধ্য হন আয়োজকরা। এই ধরনের হস্তক্ষেপের ফলে সংঘর্ষ ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং অন্তত ২৬৯ জন ব্যক্তি আহত হন এবং সমাবেশস্থল থেকে ৪৬ জন ব্যক্তিকে আটক করা হয়, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ পথচারীও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

বিগত বছরে একই সময়েই ২৩ টি ঘটনায় ৩৬৬ জন আহত এবং ৩৬ জনকে সভা সমাবেশ থেকে আটকের ঘটনা ছিলো।

সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানী

এটি উদ্বেগজনক যে, উল্লেখিত সময়ে অন্তত ২২০ টি ঘটনায় কমপক্ষে ৩৫৯ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সকল ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্ততপক্ষে ১৯২ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ৫৮ জন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ৫৫ জন সাংবাদিক। ১৮ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। এছাড়া সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ ও সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬ এর অধীনে ৩৬ জন সাংবাদিককে আসামী করে ২৩ টি মামলা হয়েছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালের (মার্চ–আগস্ট) ছয় মাসে ২২০টি সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনা ঘটেছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে ১৬৫টি ছিল। অর্থাৎ, হামলার ঘটনা প্রায় ৩৩% বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার সাংবাদিকের সংখ্যা ৩১১ থেকে ৩৫৯ জনে বেড়েছে (প্রায় ১৬% বৃদ্ধি)। আহত সাংবাদিকের সংখ্যা ১৫৪ থেকে ১৯২ জনে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সহিংসতার তীব্রতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।

উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে  গত ২৩ এপ্রিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো ফটোকার্ড ও দেয়াল লিখনকে কেন্দ্র করে ডাকসু নেতৃবৃন্দ, ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সৃষ্ট উত্তেজনার তথ্য সংগ্রহ ও পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় হেনস্থা ও মারধরের শিকার হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ অন্তত ১০ জন সাংবাদিক আহত হন। গত ২১ মে চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় এক শিশু ধর্ষণচেষ্টার ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের অবরোধ নিয়ন্ত্রণে ছোড়া গুলিতে দুইজন সাংবাদিক আহত হন। গত ১৫ জুন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বিরুদ্ধে ভুয়া, বিভ্রান্তিকর ও মানহানিকর তথ্য প্রচারের অভিযোগে ‘অগ্রযাত্রা প্রতিদিন’-এর সম্পাদকসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন বগুড়া প্রেসক্লাবের কোষাধ্যক্ষ তানভীর আলম। গত ১৬ জুলাই হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এর কার্যালয়ে অবৈধ সিলিকা বালু উত্তোলন ও মাদক কারবারের সংবাদ প্রকাশের জেরে দৈনিক ইনকিলাব ও এনপিবি নিউজ -এর বাহুবল উপজেলা প্রতিনিধি হাবিবুর রহমান নোমান ও সাংবাদিক গোলাম মোস্তফা সৈবালের উপর হামলা চালানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বাহুবল উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আব্দুর রকিব সহ কয়েকজন সংবাদিকদেরর উপর হামলা চালান। গত ২৮ জুলাই পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আসাদুজ্জামান সুমন আজকের বসুন্ধরার সাংবাদিক লালন সরকারকে বেধড়ক মারধর করেন। এমনকি মারধরের পর ভুক্তভোগী সাংবাদিককে থানায় হস্তান্তর ও  চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের অভিযোগ। গত ২৫ আগস্ট শরীয়তপুরে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ক্যাম্পাসে সকালে ডেইলি স্টারের সাংবাদিক জাহিদ হাসান, নিউজ টুয়েন্টিফোর টেলিভিশন ও জাগো নিউজ প্রতিনিধি বিধান মজুমদার ও মানবকণ্ঠের জেলা প্রতিনিধি বরকত মোল্লাকে মারধর করা করা হয়। এমনকি মারধরের বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে আরেক সাংবাদিককে হুমকি দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘তোমরা লেখবা, আমরা পিডামু।’ এছাড়া গত ২৫ আগস্ট যশোরের শার্শা উপজেলার নাভারণ বুরুজবাগান উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে অ্যাডহক কমিটির সভা চলাকালীন সময় তথ্য সংগ্রহ করতে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছেন স্থানীয় পাঁচজন সাংবাদিক। হামলার শিকার পাঁচ সাংবাদিক হলেন- আনিসুর রহমান, আলমগীর হোসেন, সাহাবুদ্দিন আহম্মেদ, আতিকুজ্জামান রিমু ও রাহাত হোসেন।

মত প্রকাশের স্বাধীনতা

মার্চ-আগস্ট মাসে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ ও সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬-এর বিভিন্ন ধারার অধীনে পৃথক ৪১ টি মামলায় ৯১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে ৬১ জনকে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দেওয়ায় ৫ জনকে আটক করা হয়েছে। অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যাক্তির সমালোচনায় নিহত ১ জন, আহত ২০ জন, ও আটক হয়েছেন ২০ জন । এছাড়া ১৯ জনকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও কুরআন অবমাননার অভিযোগে আটক করা হয়েছে, এবং অন্যান্য ইস্যুতে আরও ২৩ জনকে আটক করা হয়েছে।

অন্যদিকে, ২০২৫ সালের একই সময়ে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩–এর অধীনে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ৪টি মামলাসহ মোট ১৫টি মামলায় ২৩ জনকে অভিযুক্ত এবং ১৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে সাইবার আইনের প্রয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মামলার সংখ্যা, অভিযুক্ত ও গ্রেফতারের হার বেড়েছে এবং আইনের প্রয়োগ সাংবাদিকদের পাশাপাশি রাজনৈতিক মতপ্রকাশ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার এবং ধর্মীয় ইস্যুতেও বিস্তৃত হয়েছে। এতে সাইবার আইনের প্রয়োগের পরিধি ও প্রভাব আগের বছরের তুলনায় আরও ব্যাপক হয়েছে।

উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে গত ৩ মার্চ পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ফেসবুকে বিএনপি নেতা জহিরুল ইসলামের বিরূদ্ধে সমালোচনামূলক পোস্ট দেওয়ায় মো. ইদ্রিস (৪৫) নামে একজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। গত ২৬শে মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আপত্তিকর পোস্ট শেয়ার করার অভিযোগে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় আজিজুল হক নামের এক ব্যক্তিকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার করা হয় । গ্রেফতারের পরদিন সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ও সন্ত্রাস দমন আইনে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। গত ২ এপ্রিল মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে ফেসবুকে আপত্তিকর মন্তব্য ও কটুক্তির অভিযোগে শাওন মাহমুদ (৩৫) নামের এক যুবককে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন স্থানীয় যুবদলের নেতাকর্মীরা। পরে তাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। গত ১১ জুন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আপত্তিকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে মিজানুর রহমান (২৪) নামের এক যুবককে আটক করে পুলিশ।

মব সহিংসতা ও গণপিটুনী

উল্লেখিত ছয় মাসে গণপিটুনী ও মব সহিংসতার কমপক্ষে ৩০০ টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১৪২ জন এবং আহত হয়েছেন ৩২৭ জন।

অন্যদিকে, ২০২৫ সালের একই সময়ে ১৮১ টি ঘটনায় অন্তত ৮৭ জন নিহত এবং ১৭৭ জন আহত হন। ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে গণপিটুনি ও মব সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ঘটনাসংখ্যা, নিহত ও আহত—সব সূচকেই বড় ধরনের ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বিচারবহির্ভূত জনতা-নির্ভর সহিংসতার প্রবণতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত বহন করে।

উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে ৪ মার্চ সাতঘরিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের বিদ্যুতের তার চুরি করে পালানোর সময় মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মো. সাগর (৩২) ও সানারুল (৩৪) নামের দুই যুবককে চুরির অভিযোগে গাছে বেঁধে রাত থেকে সকাল পর্যন্ত গাছের সঙ্গে বেঁধে দফায় দফায় পিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়।  ৬ এপ্রিল বাগেরহাটের মোল্লাহাটে ঘের থেকে মাছ চুরির দায়ে শুকুর (৪২) নামে এক যুবককে উত্তেজিত জনতা ব্যপক মারধর করে। মারধরেরের এক পর্যায়ে শুকুরের হাত-পা ভেঙে যায় এবং এদের মধ্যে থাকা কিছু দুষ্কৃতিকারী শুকুরের চোখ উপড়ে ফেলে। গত ৯ মে গাজীপুরের কালিয়কৈর উপজেলার বাগচালা এলাকায় গরু চুরির অভিযোগে এলাকাবাসী তিন সদস্যকে গণপিটুনী দেয়, এতে ঘটনাস্থলের তিনজনের মৃত্যু হয়। গত ২১ জুন চট্টগ্রাম মহানগরের পলোগ্রাউন্ড মাঠ সংলগ্ন এলাকায় চুরির অভিযোগে অজ্ঞাত এক যুবককে পেটানোর পর বৈদ্যুতিক শক দিয়ে হত্যা করা হয়। এমনকি পুলিশ মরদেহ উদ্ধারে গেলে স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের গাড়ি অবরোধ করে রাখে। গত ৩০ জুন সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার তোয়াকুল ইউনিয়নে একটি ছোট নৌকা চুরির অভিযোগে খালেদ আহমদ (২০) নামে এক যুবককে নির্জন বাড়িতে আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হয়। এমনকি নির্যাতনের একপর্যায়ে তার দুটি চোখই উপড়ে ফেলে তারা। গত ১৮ আগস্ট খুলনা মহানগরের বয়রা রায়েরমহল বড় মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে স্থানীয় লোকজনের গণপিটুনিতে রাজু বিশ্বাস নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়। গত ১৯ আগস্ট গাজীপুরের শ্রীপুরে প্রেমের ফাঁদে ফেলে আপত্তিকর ভিডিও ধারণ ও অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে এক নারীসহ চারজনকে আটক করে মারধর করার পর পুলিশে সোপর্দ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন 

এটি উদ্বেগজনক যে, এই সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর কমপক্ষে ৩৬ টি হামলার ঘটনায় ৩১ জন আহত হয়েছেন, এবং ১৮ টি মন্দির, ১৪ টি প্রতিমা ও ৫৪ টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে । এছাড়া ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী এক নারী গণধর্ষণের শিকার হয়ছেন।  

অন্যদিকে, ২০২৫ সালের একই সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ১০টি হামলায় ৪ জন আহত হন। সে সময়ে ৩ টি মন্দির, ৫টি প্রতিমা এবং ৩৯ টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার সংখ্যা, আহতের সংখ্যা এবং ধর্মীয় ও আবাসিক স্থাপনায় হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে গত ৮ মার্চ শনিপুজা চলাকালে কুমিল্লা নগরীর দক্ষিণ ঠাকুরপাড়া (বাগানবাড়ি) এলাকার কালী গাছতলা শিব মন্দিরসহ আশপাশের এলাকায় ককটেল বিষ্ফোরণে পুরোহিত কেশব চক্রবর্তীসহ ৪ জন আহত হন। গত ৪ মে বাগেরহাট জেলার শরনখোলায়র রতিয়া রাজাপুর গ্রামে জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে রবীন ঢালী নামে একটি সংখ্যালঘু (হিন্দু) পরিবারের উপর হামলা, বসতঘর ও আসবাবপত্র ভাংচুর, ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এসময় বাড়িতে থাকা ৫ জন নারী সদস্য সন্ত্রাসীদের মারধরের শিকার হন। গত ১৩ জুন বগুড়ার মোকামতলা উপচেলার কানছগাছি এলাকায় মহাশ্মশানের শিব মন্দির, কানছগাড়ি শীতলা মন্দির ও কালী মন্দিরের প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়েছে। এছাড়া ১৬-১৮ জুন তিন দিনের ব্যবধানে ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলায় দুইটি মন্দিরে হামলা ও প্রতিমা ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। গত ১৮ জুন খাগড়াছড়ির গুইমারায় মারমা সম্প্রদায়ের এক বিধবা নারীকে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাম থেকে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে নিয়ে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।

সীমান্তে হত্যা ও নির্যাতন

গত ছয় মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৩২ টি হামলার ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হামলায় নিহত ১১, আহত হয়েছেন ২৯ জন, এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন ১৬ জন । ২৯ জনকে বিভিন্ন সীমান্ত থেকে আটক করা হয়েছে। অপরদিকে সিলেট সীমান্তে খাসিয়া সম্প্রদায়ের গুলিতে ৩ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন এবং সীমান্তে ১১ জনের লাশ পাওয়া গেছে। এছাড়া ২০২৬ সালে পুশ-ইন ও পুশ-ইনের চেষ্টার ঘটনা নতুন করে বড় উদ্বেগের বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে, যা সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেয়।

অন্যদিকে, ২০২৫ সালের একই সময়ে সীমান্তে ৪৭ টি ঘটনায় বিএসএফের গুলিতে ২০ জন বাংলাদেশি নিহত, ২৪ জন আহত এবং ২৮ জন গ্রেফতার হন। এছাড়া সিলেট সীমান্তে ভারতীয় খাসিয়া ও অন্যান্য ঘটনায় গুলি ও নির্যাতনে ৩ জন নিহত ও ৪ জন আহত হন। ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে সীমান্তে হামলার সংখ্যা (৪৭ থেকে ৩২) এবং নিহতের সংখ্যা (২০ থেকে ১১) কমেছে, তবে আহতের সংখ্যা (২৪ থেকে ২৯) এবং আটকের সংখ্যা (২৮ থেকে ২৯) বেড়েছে।

উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে গত ৭ এপ্রিল লালমনিরহাটের পাটগ্রামের ধবলগুড়ি সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিক আলী হোসেন (৪৯) নিহত হয়েছেন। গত ০৯ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় ভারতীয় সীমান্তে বিএসএফের ছোড়া গুলিতে মো. মুরসালিন (২০) ও নবীন হোসেন (৫৫) নামে দুই বাংলাদেশী নিহত হন। এছাড়া গত ১৪ মে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার আমঝোল সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এর গুলিতে খাদিমুল ইসলাম (২৫) নামে এক বাংলাদেশী যুবক নিহত হন। গত ১২ জুন মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে মুজিব আলী (২০) নামে এক বাংলাদেশি তরুণ নিহত হয়েছেন। গত ১০ জুলাই সিলেটের গোয়াইনঘাট সীমান্তে ভারতীয় স্থানীয় বাসিন্দা খাসিয়াদের গুলিতে মিনহাজ উদ্দিন (২৫) নামে এক বাংলাদেশি যুবক নিহত হয়েছেন। গত ৯ আগস্ট মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সীমান্তের ওপারে ভারতের মাগুরুলি এলাকায় বিএসএফের গুলিতে তারা মিয়া (২০) এবং গত ৩০ আগস্ট পৃথক আরেকটি ঘটনায় হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার চিমটিবিল সীমান্তে সোহাগ মিয়া নামের এক বাংলাদেশি যুবক নিহত হন।

অপরদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ১৪ টি সহিংসতার ঘটনায় স্থল মাইন বিষ্ফোরণে ৭ জন নিহত, ৪ জন আহত এবং ৭৮ জনকে আটক করা হয়েছে।

২০২৫ সালে একই সময়ে অন্তত ১১টি ঘটনায় ২জন নিহত, ১১জন আহত, ২জন গুলিবিদ্ধ ও ২৭জনকে আটক করা হয়।

উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে গত ০৬ মার্চ বান্দরবানের সীমান্তবর্তী নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে পুতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে আবদুল জব্বার (৫৩) নামে এক ব্যক্তি গুরুতর আহত হন। বিস্ফোরণে তার একটি পা উড়ে যায়। ২৪ মে বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম এলাকায় আরাকান আর্মি কর্তৃক পুতে রাখা স্থলমাইন বিষ্ফোরনে লেয়ারা (৪১), অংকেমন (৫০) ও চিংকা অং (৪০) নামে তিন স্থানীয় নিহত হন। গত ০২ জুন বান্দরবানে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্তে পরিত্যক্ত মর্টারশেল বিস্ফোরণে সতনাইং তঞ্চঙ্গ্যা নামে ১২ বছরের এক কিশোর ও গত ২৪ জুন একই সীমান্তবর্তী ভালুকিয়া এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে মো. শফি আলম (৩০) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছেন। গত ৯ জুন একই সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে আব্দুল খালেক (৩০) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া গত ৬ জুন মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বগারদিয়া এলাকায় মাছ ধরতে গেলে আরাকান আর্মির গুলিতে মো. আইয়ুব (২৮) নামে এক রোহিঙ্গা যুবক আহত হন। গত ২৮ জুলাই বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার জারুলিয়াছড়ি সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে আরাকান আর্মি কর্তৃক পুতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে আবদুল করিম (২৫) নামের এক বাংলাদেশি যুবক গুরুতর আহত হয়েছেন। বিস্ফোরণে তাঁর বাঁ পায়ের হাঁটুর নিচের অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। গত ২৪ আগস্ট বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের মিয়ানমার অংশে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে মো. সাইফুল (২৫) নামে এক বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। বাঁশ কাটতে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে যাওয়ার পর পুঁতে রাখা ল্যান্ডমাইনের ওপর পা পড়লে বিস্ফোরণে তার দুই পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

বিচার বহির্ভূত হত্যা (হেফাজতে/নির্যাতনে/গুলি/বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যু)

দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, ভিকটিমের পরিবার ও এইচআরএসএস এর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজত, নির্যাতন, গুলিবর্ষণ এবং কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’-এর ঘটনায় অন্তত ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হেফাজতে ও নির্যাতনের শিকার হয়ে ৫ জন, গুলিবিদ্ধ হয়ে ১ জন এবং বন্দুকযুদ্ধে ২ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া আইন শৃ্খলা বাহিনীর ধাওয়া খেয়ে গ্রেফতার এড়াতে পালাতে গিয়ে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

অন্যদিকে, ২০২৫ সালের একই সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, হেফাজত ও নির্যাতনের ঘটনায় অন্তত ১৬ জন নিহত হন। এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে ৬ জন, নির্যাতনে ৪ জন, গুলিবিদ্ধ হয়ে ৬ জন। এছাড়া পুলিশের ভয়ে পালানোর সময় ২ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে গত ৫ মার্চ ২০২৬, নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলায় পুলিশের একটি অভিযানের সময় আব্দুল হামিদ ধলা (৬৬) নামে এক ব্যক্তির মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। পরিবারের দাবি, পুলিশের লাথির আঘাতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং পরবর্তীতে মারা যান। গত ১৮ মে ‍সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের শতমুখী খাল এলাকায় কাঁকড়া আহরণের সময় বন বিভাগের কর্মীদের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে আমিনুর রহমান গাজী (৪৫) নামে এক জেলে নিহত হয়েছেন। ২১ জুন ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলায় ডিবি (গোয়েন্দা) পুলিশের হেফাজতে মির্জা ইস্তিয়াক আহমেদ প্রান্ত (২৬) নামে এক ছাত্রলীগ কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের দাবি, পুলিশের নির্যাতনের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ জুন খাগড়াছড়ির রামগড়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে গোলাগুলির সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে ববিন ত্রিপুরা (৩২) নামে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ-প্রসীত) সদস্য নিহত হন। ২৫ জুন খুলনার কয়রা উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় কোস্ট গার্ডের সঙ্গে কথিত ডাকাত ‘দুলাভাই বাহিনীর’ সদস্যদের বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে সাকাত সরদার (৬০) নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। গত ৯ জুলাই শোরগঞ্জের নিকলী থানা–হাজত থেকে রুবেল মিয়া (২১) নামের এক আসামির ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। গত ২০ জুলাই বগুড়া জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে থাকা আসাদুজ্জামান আসাদ (২৫) নামের এক আসামির মৃত্যু হয়েছে। জানা যায়, গত ২৯ জুন সারিয়াকান্দিতে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক আবদুল মান্নান মোল্লা (৪৫) হত্যা মামলার প্রধান আসামি হিসেবে আসাদকে গ্রেপ্তার করে জেলা ডিবি পুলিশ। তবে আটকের পরে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাজতখানার ওয়াশরুমে তার লাশ পাওয়া যায়। গত ৩০ জুলাই দপুরের ফরিদগঞ্জে সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার মিজানুর রহমান (৫৫) নামে এক ব্যক্তি পুলিশ হেফাজতে মারা গেছেন।

গুম/ জোরপূর্বক নিখোঁজের অভিযোগ

দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, ভিকটিমের পরিবার ও এইচআরএসএস এর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী বাগেরহাটের মোংলায় কোস্ট গার্ড পরিচয়ে মিরাজ শেখ (৩২) নামে এক যুবককে তুলে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংবাদ সম্মেলনে তার পরিবারের সদস্যরা দাবি করেন, গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যায় জয়মনি ঠোঁটার একটি চায়ের দোকান থেকে দুজন সিভিল পোশাকধারী কোস্টগার্ড সদস্য মিরাজ শেখকে আটক করে হাড়বাড়িয়া স্টেশনে নিয়ে যায়। সেখানে মিরাজকে মারধরের পর মোংলার দিক থেকে আসা ‘বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড’ লেখা স্পিডবোটে থাকা সাত-আটজন ইউনিফর্ম পরিহিত সদস্য তার ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন। ঘটনাটি স্থানীয় গ্রামবাসী ও মিরাজের স্ত্রীর সামনেই ঘটে।

পরিবারের পক্ষ থেকে আরো অভিযোগ করা হয়, মিরাজের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি প্রথমে স্থানীয় দোকানদার আল আমিনের জিম্মায় রেখে গেলেও ৮-১০ দিন পর গভীর রাতে দুজন কোস্ট গার্ড সদস্য তা নিয়ে যান। কোস্ট গার্ডের মোংলা পশ্চিম জোনের লেফটেনেন্ট কমান্ডার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘মিরাজের বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। তবে এলাকাবাসীর দাবি, কোস্ট গার্ড মিরাজকে তুলে নিয়ে গেছে। এ ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি), সংবাদ সম্মেলন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত আবেদন করা হলেও এখনো তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।

কারা হেফাজতে মৃত্যু

চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট, এই ছয় মাসে সারাদেশে কারাগারে কমপক্ষে ৪৭ জন আসামী মারা গিয়েছেন। ৪৭ জনের মধ্যে ১৩ জন কয়েদী ও ৩৪ জন হাজতি। এর মধ্যে ৮ জন আওয়ামীলীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের, ১ জন বিএনপির এবং ৩৮ জন সাধারণ কয়েদী।

২০২৬ সালের (মার্চ–আগস্ট) ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন কারাগারে কমপক্ষে ৪৭ জন আসামির মৃত্যু হয়েছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে ৩৯ জন ছিল। অর্থাৎ, এই বছরে কারা হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ পরিস্থিতি কারাগুলোর স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা ও বন্দি ব্যবস্থাপনা নিয়ে আরও গভীর পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তার দাবি রাখে।

উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে গত ১৫ মার্চ সকালে কারাবরণ অবস্থায় অসুস্থ হয়ে রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার হাটশেরপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শাহনূর আলম (৬০)। গত ১৯ মে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে জুলাই-আগস্টের হত্যা মামলার আসামী ও কারাবন্দী দেবাশীষ চৌধুরী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তবে মৃতের পরিবারের অভিযোগ, কারাগারের ভিতর নির্যাতনে দেবাশীষ চৌধুরীরর মৃত্যূ হয়েছে। গত ১৮ জুন কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে শহিদুল্লাহ রাসেল (৪১) নামে এক যুবদল কর্মীর মৃত্যু হয়। তিনি একটি মাদক সংশ্লিষ্ট মামলায় কারাগারে বন্দী ছিলেন। চলতি মাসের ১৫ জুলাই থেকে ২৫ জুলাই ১০ দিনের ব্যবধানে সিরাজগঞ্জ জেলা কারাগারে তিন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জুলাই অসুস্থ হয়ে পড়ার পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের শাহজাদপুর ইউনিয়ন নেতা আমিনুল ইসলাম লিটন (৪৭), ২৩ জুলাই সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার রতনকান্দি ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক বাবলু মন্ডল (৫২), এবং ২৫ জুলাই ঢাকার প্রিজন হাসপাতালে কাওসার হোসেন (২২) নামে এক বন্দী চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। গত ৫ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের আইসিইউতে পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান খান মনির খান (৪৮) মারা যান। এছাড়া গত ২৬ আগস্ট সাজা শেষ হওয়ার একদিন আগে দিনাজপুর জেলা কারাগারে মো. নাদিম নামে এক কয়েদির মৃত্যূ হয়েছে।

 

অজ্ঞাত লাশ 

২০২৬ সালের মার্চ-আগস্ট মাসে সারাদেশে নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থানে দুর্বৃত্তদের হাতে পরিকল্পিত বা অপরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ডের ৩৪৫ টি ঘটনায় ৩৬৪ টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে বস্তাবন্দি অবস্থায় ৩৫ টি, ঝুলন্ত অবস্থায় ৬১ টি, শরীরে একাধিক আঘাতসহ ৬০ টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া গলা কেটে হত্যা ২৭ টি, হাত-পা বাঁধা ২১ টি লাশ পাওয়া গেছে। এছাড়া এর বাইরে নানা ধরণের পরিস্থিতিতে আরও ১৬০ টি লাশ পাওয়া গেছে।

শ্রমিক নির্যাতন

গত ছয় মাসে ৪৩২ টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১০৫ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৭৪৫ জন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় অন্তত ৩০০ জন শ্রমিক তাদের কর্মক্ষেত্রে মারা গেছেন। বেতন ভাতার দাবিতে আন্দোলনের সময় ২৬ জনকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া ৪ জন গৃহপরিচালিকা নিহত ও ২ জন আহত হয়েছে। এছাড়া ৩ জন গৃহপরিচালিকার রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে।

অন্যদিকে, ২০২৫ সালের একই সময়ে ১০৫ টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় ২৮ জন নিহত এবং ৫৯৭ জন আহত হন। কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে ৭১ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এছাড়া মালিকের নির্যাতনে ৪ জন গৃহকর্মী নিহত এবং ২ জন গুরুতর আহত হন। বেতন–ভাতা ও ঈদ বোনাসের দাবিতে শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুলিশ-শ্রমিক সংঘর্ষে বহু শ্রমিক আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে।

উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে গত ৩০ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার উত্তর মৌড়াইল এলাকায় চিকিৎসক দম্পতি কে. এম. আব্দুল্লাহ আল নোমান ও কিমিয়া সাদাত তোফা কর্তৃক আয়েশা আক্তার (১০) নামে এক গৃহকর্মীকে নির্মমভাবে নির্যাতন করার অভিযোগ উঠেছে। গত ১৭ জুন খুলনা নগরীর সোনাডাঙ্গা আবাসিক মিলন দাস (২২) নামে এলাকায় পিতৃ-মাতৃহীন কিশোরী সোনাডাঙ্গা মডেল থানার উপসহকারী পরিদর্শক (এএসআই) সঞ্জয় মিত্র ও তার স্ত্রী পপি মিত্র কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ভুক্তভোগী গৃহকর্মী হিসেবে ছোটবেলা থেকেই পুলিশ দম্পতি বাসায় থাকতেন। গত ১৭ জুন রংপুর মহানগরীর কলেজ রোড়ের খামারপাড়া মোড় এলাকার একটি হোটেলে ময়লা পরিষ্কার করা নিয়ে কথা কাটাকাটির জেরে মো. শাওন (২৫) নামে এক কর্মচারীকে পিটিয়ে হত্যা করে দোকানের মালিক। গত ২০ জুন রাজধানীর ভাষানটেকের কচুক্ষেত এলাকায় বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি পোশাক কারখানা খুলে দেওয়া এবং বকেয়া বেতন–ভাতার দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় কয়েকজন শ্রমিককে মারধরের অভিযোগও উঠেছে। এছাড়া ঘটনাস্থল থেকে ২৬ শ্রমিককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গত ৩১ জুলাই নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের সাইলো গেট এলাকায় সাদ্দাম সরদার (৩৫) নামে এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, তাঁর তাঁর ডান হাতের চামড়া উঠে যাওয়া, পেটে কালচে আঘাতের চিহ্ন এবং দুই পায়ে বেধড়ক পিটুনির ছাপ ও ঝলসে যাওয়ার ক্ষতচিহ্ন রয়েছে। গত ১২ আগস্ট সিলেট নগরীর রায়নগরের রাজবাড়ী মিতালী আবাসিক এলাকার গৃহকর্তা আব্দুস সত্তার মিয়া (৮২), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭২) ও গৃহপরিচারিকা তাহমিনা (১৫) কে একই বাসায় গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। গত ১৫ আগস্ট চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে জাহাজের ভেতরে মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইডের বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে ১০ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন

গত ছয় মাসে (মার্চ–আগস্ট) কমপক্ষে ১৬৯৫ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অন্তত ৫০৩ জন, যাদের মধ্যে ৩১০ জন (৬২%) ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, ৯৪ জন (১৯%) নারী ও কন্যা শিশু গণধর্ষনের শিকার হয়েছেন এবং ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়েছে ২০ জনকে। ধর্ষিত হয়ে আত্মহত্যা করেছেন ১ জন। ৪৭৩ জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন তন্মধ্যে শিশু ২৩২ (৪৯%) জন। এছাড়া, যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত ২৫, আহত হয়েছেন ২৭ জন নারী এবং আত্মহত্যা করেছেন ৪ জন নারী। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৩২৯ জন, আহত হয়েছেন ২০২ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ২০৬ জন নারী। এছাড়া এসিড সহিংসতায় আহত হয়েছেন ৩ জন নারী।

২০২৬ সালের (মার্চ–আগস্ট) ছয় মাসে কমপক্ষে ১৬৯৫ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে ১১২৬ জন ছিল। অর্থাৎ, নির্যাতনের ঘটনা প্রায় ৫১% বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালে ধর্ষণের শিকার হন ৫০১ জন, যার মধ্যে ২৯৭ জন (৫৯%) শিশু, ১১৫ জন গণধর্ষণের শিকার, ১৭ জন ধর্ষণের পর হত্যা এবং ৪ জন আত্মহত্যা করেন। পারিবারিক ও যৌতুকজনিত সহিংসতায় ২০২৬ সালে বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়। পারিবারিক সহিংসতায় ২০২৬ সালে ২২৯ জন নারী নিহত, ২০২ জন আহত এবং ২০৬ জন আত্মহত্যা করেন। যা ২০২৫ সালে পারিবারিক সহিংসতায় ১৭৭ জন নিহত, ৪৩ জন আহত এবং ৮৯ জন আত্মহত্যার ঘটনা ছিল। এছাড়া, যৌতুকের কারণে ২০২৬ সালে ২৫ জন নারী নিহত, ২৭ জন আহত এবং ০৪ জন আত্মহত্যা করেন। যা ২০২৫ সালে যৌতুকের কারণে ১৬ জন নিহত, ১৮ জন আহত এবং ৪ জন আত্মহত্যার ঘটনা ছিল।

শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।

২০২৬ সালে ১,৩৩৫ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৪৭০ জন প্রাণ হারিয়েছে এবং ৮৬৫ জন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা ছিল ৭৪০ জন শিশু, যার মধ্যে ১১৯ জন নিহত এবং ৬২১ জন নির্যাতনের শিকার হয়।

সর্বোপরি, ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রায় সব সূচকেই বৃদ্ধি দেখা গেছে। বিশেষ করে শিশু নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা, যৌন নিপীড়ন ও প্রাণহানির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এসব তথ্য নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা, সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম আরও জোরদারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে গত ২ মার্চ চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে ইকোপার্কের নির্জন এলাকা থেকে জান্নাতুল নিশা ইরা (৭) নামে এক শিশুকে ধর্ষনের পর গলা কেটে হত্যার চেষ্টা করা হয়। ঘটনার পরের দিন  চিকিৎসাধীন অবস্থায় শিশুটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করে। গত ১৪ মার্চ চুয়াডাঙ্গা দামুড়হুদায় দলিয়াপুর জোবেদা খাতুন (৪৫) নামে এক বিধবা নারীকে গণধর্ষণের পর কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ২২ মার্চ নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে যৌতুক না পেয়ে গৃহবধূ অনিকা খাতুন ওরফে ফারহানা (২৪) তার স্বামী মো: সাগর কতৃক নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়। ৩০ মার্চ ময়মনসিংহের ফুলপুরে ধর্ষনের অভিযোগ ওঠার পর এক কিশোরীর (১৩) বিষপানে আত্নহত্যার ঘটনা ঘটেছে। গত ২ এপ্রিল যশোরের অভয়নগরে স্বামীকে তালাক দিতে অস্বীকৃতি জানালে ক্ষোভে মাসুরা বেগমকে (১৯)  ঘুমের ওষুধ মিশ্রিত কোমল পানীয় পান করিয়ে অচেতন অবস্থায় তার পায়ে ও যৌনাঙ্গে অ্যাসিড নিক্ষেপ করে। গত ১০ এপ্রিল কুমিল্লার মুরাদনগরে ৮ বছর বয়সী এক শিশু ধর্ষনের শিকার হয়। প্রতিবাদ করতে গেলে ধর্ষিতার মামার পায়ের রগ কেটে ফেলার ঘটনা ঘটে। গত ১৩ এপ্রিল টাঙ্গাইলে স্বামীকে  মাদকের টাকা দিতে অস্বীকার করলে ঝগড়ার একপর্যায়ে কেরোসিন তেল দিয়ে আগুন ধরিয়ে স্ত্রী নাজমা হরিজনকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। গত ০৩ মে ফরিদপুরে ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে আইরিন আক্তার কবিতা (৭) নামে এক শিশুকে শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনা ঘটে। গত ১৯ মে রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী এলাকায় ৭ বছরের শিশুকে রামিসা আক্তারকে পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া সোহেল রানা (৩০) ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করে। ২২ মে নওগাঁ জেলায় যৌতুকের টাকা না পেয়ে রেহানা (২০) নামে এক গৃহবধূকে পিটিয়ে হত্যা করেছে তার স্বামী ও শাশুড়ি। ৩০ মে জামালপুরের ইসলামপুর গভীর রাতে অ্যাসিড নিক্ষেপ করে আখিয়া আক্তার (২৮) নামে এক নারীকে আহত করার ঘটনা ঘটে। ৪ জুন পারিবারিক সহিংসতায় চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় স্বামী কতৃক  সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর শিখা খাতুন (১৯) পেটে লাথি মেরে গর্ভের সন্তান হত্যার ঘটনা ঘটে। ৯ জুন কুমিল্লার তিতাস উপজেলায় সকাল ৮ টার দিকে বেগম ফজিলাতুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ঢুকে দীর্ঘদিন ধরে উত্ত্যক্ত করা বখাটেদের দ্বারা স্কুলছাত্রী হীরামনির (১৪) ওপর এসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। ১৫ জুন ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় কদম ফুল দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে নিখোঁজের কয়েক ঘণ্টা পর সংঘবদ্ধ  ধর্ষণে হত্যার শিকার  নিশামনি (৫) নামে এক শিশুর মরদেহ কংস নদী থেকে উদ্ধার করা হয়। ২৩ জুন রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় সানজিদা খাতুন (৯) নামে কিন্ডারগার্টেনের দ্বিতীয় শ্রেণির শিশুকে অশ্লীল ভিডিও দেখিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। গত ২৫ জুন বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার কবাই ইউনিয়নের লক্ষ্মীপাশা গ্রামে যৌতুকের জন্য রিমা আক্তার মাহফুজা (৩০) নামে দুই সন্তানের জননীকে নির্যাতনের পর হত্যার ঘটনা ঘটে। গত ৬ জুলাই মৌলভীবাজারে রাজনগর উপজেলায় রাজনগর উপজেলার মুন্সীবাজার ইউনিয়নের করিমপুর গ্রামে আলমগীর হোসেন নামে স্থানীয় এক বাসিন্দার বাড়ির উঠান খুঁড়ে নিজ স্ত্রী জাহেদা বেগমের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্ত্রীকে হত্যার পর মরদেহ মাটিচাপা দেওয়ার অভিযোগে আলমগীর হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত ২ আগস্ট ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলায় রেল লাইনের পাশ থেকে মাহমুদা নামে নয় বছর বয়সী এক শিশুকে উদ্ধার করে পুলিশ। পরিবারের অভিযোগ, শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। গত ২০ আগস্ট রাজবাড়ির পাংশা থানায় নিখোঁজের দুইদিন পর এক নারীর (৩৫) অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের ধারণা মতে, ধর্ষনের পর ভুক্তভোগী নারীকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।

মামলা ও গ্রেফতার

এই সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মী এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ধারায় কমপক্ষে ১৯৯ টি মামলা হয়েছে। এ সকল মামলায় ৩৭৩৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ১০৭৯৯ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামী করা হয়েছে। এ সময়ে কমপক্ষে ২৯,০৯৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যেখানে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মী অন্তত ২,৮৩৬ জন,  বিএনপির নেতাকর্মী ৩১৮ জন, জামায়াতের ৫৮ জন, এনসিপির ৩৩ জন এবং চরমপন্থি ২৮ জন। এই সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সারাদেশে যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয় যেখানে প্রায় ২৭ সহস্রাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ।

অন্যদিকে, ২০২৫ সালের একই সময়ে ১২৭টি মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় ৭৮৬৬ জনের নাম উল্লেখ এবং ২৮,৪৩৪ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। একই সময়ে বিভিন্ন মামলায় ৩৭,১৩৫ জন গ্রেফতার হন, যার মধ্যে ১১,৩৮৮ জনই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী।

 

প্রতিবেদনে উপস্থাপিত তথ্য ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) নিম্নোক্ত সুপারিশসমূহ প্রদান করছে:

সুপারিশসমূহঃ

Ø  রাজনৈতিক সহিংসতা প্রতিরোধে সকল রাজনৈতিক দলের জন্য আচরণবিধির কঠোর বাস্তবায়ন, অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক সংঘাতের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে।

Ø  বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, হেফাজতে মৃত্যু, নির্যাতন ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের প্রতিটি অভিযোগের স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করে দায়ীদের জবাবদিহি ও ন্যায়সংগত বিচারের আওতায় আনতে হবে।

Ø  মব সহিংসতা ও গণপিটুনি রোধে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিরুদ্ধে আইনের কার্যকর প্রয়োগের  পাশাপাশি গুজব, উসকানি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্যের বিস্তার প্রতিরোধে জনসচেতনতা ও কার্যকর তথ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

Ø  মতপ্রকাশ, সংবাদমাধ্যম ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী নিশ্চিত করতে হবে এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও পেশাগত স্বাধীনতা রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

Ø  সাইবার আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধান আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে সংস্কার করে অস্পষ্ট, অতিরিক্ত বিস্তৃত ও অপব্যবহারযোগ্য ধারাসমূহ পর্যালোচনা করতে হবে এবং আইন প্রয়োগে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।

Ø  নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ধর্ষণ, যৌন সহিংসতা, পারিবারিক সহিংসতা ও যৌতুক-সংক্রান্ত অপরাধের দ্রুত বিচার, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা, পুনর্বাসন এবং শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

Ø  ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপাসনালয়, বসতবাড়ি ও সম্পত্তির সুরক্ষা বৃদ্ধি, হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

Ø  শ্রম অধিকার নিশ্চিত করতে নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য মজুরি, সময়মতো বেতন-ভাতা প্রদান, শ্রমিক সংগঠনের স্বাধীনতা এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা মানদণ্ড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

Ø  কারাগার ও হেফাজতে মানবাধিকার সুরক্ষায় বন্দিদের পর্যাপ্ত চিকিৎসা, মানবিক পরিবেশ, নিয়মিত স্বাধীন পরিদর্শন এবং হেফাজতে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।

Ø  সীমান্তে হত্যা, গুলিবর্ষণ, নির্যাতন, আটক ও পুশ-ইন বন্ধে প্রতিটি ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং মানবাধিকারভিত্তিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা জোরদার করে সীমান্তবর্তী বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

Ø  জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত রেখে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক, প্রশাসনিক ও আইনগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি।

Ø  মানবাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত যেকোনো আইন বা অধ্যাদেশ সংসদে বিবেচনার সময় জনমত, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডকে গুরুত্ব দিতে হবে। আইন যেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা বিরোধী মত দমনের হাতিয়ার না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

Ø  নিরাপদ অভিবাসন ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের সুরক্ষায় বিদেশে কর্মসংস্থানের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, মানবপাচার প্রতিরোধ এবং জরুরি কনস্যুলার সহায়তা জোরদার করতে হবে।

Ø  আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন যাতে সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করা হয় সে বিষয়ে সামগ্রিক কর্মতৎপরতা, আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতির উন্নতি, নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালীকরণ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

Ø  আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীতে পরিমার্জন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ও জনগণের আস্থা অর্জনে আইনের অপপ্রয়োগ বন্ধ ও আইনের দৃষ্টিতে সকলের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

মার্চ–আগস্ট ২০২৬ সময়কালের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মানবাধিকার পরিস্থিতির টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন আইনের শাসন, রাজনৈতিক সহনশীলতা, স্বাধীন ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, পেশাদার ও নিরপেক্ষ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্বাধীন গণমাধ্যম এবং শক্তিশালী মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান। রাজনৈতিক সহিংসতা, মব ও গণপিটুনি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, সীমান্তে প্রাণহানি, শ্রম অধিকার লঙ্ঘন এবং নাগরিক নিরাপত্তাহীনতার মতো বিষয়গুলো কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা না গেলে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

এইচআরএসএস মনে করে, রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সাংবিধানিক অধিকার সমানভাবে সুরক্ষিত করার পাশাপাশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিটি অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহিতা এবং ভুক্তভোগীদের কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের মধ্যে গঠনমূলক সংলাপ ও অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এই প্রেক্ষাপটে এইচআরএসএস সরকারের প্রতি মানবাধিকার, আইনের শাসন ও নাগরিক স্বাধীনতা সুরক্ষায় আরও দায়িত্বশীল, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার সংগঠন এবং সর্বস্তরের নাগরিকদের প্রতি সহনশীলতা, দায়িত্বশীলতা ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে একটি নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানাচ্ছে। গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ, আইনের সমান প্রয়োগ এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই একটি মানবিক, জবাবদিহিমূলক ও অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

Reports Files

No Data Found!