Menu

Monthly Report

Human Rights Situation June 2026

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি প্রতিবেদন (জুন-২০২৬)

বাংলাদেশে ২০২৬ সালের জুন মাসে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার, আইনের শাসন, জননিরাপত্তা এবং সংখ্যালঘু ও অন্যান্য দুর্বল জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ ও উদ্বেগজনক মানবাধিকার পরিস্থিতি অব্যাহত ছিল, যা মানবাধিকার সুরক্ষা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে বিদ্যমান ঘাটতিকে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে। রাজনৈতিক সহিংসতা, দলীয় অন্তর্কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হয়রানি, শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশে বাধা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন কর্মকাণ্ড মানবাধিকার পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। একই সঙ্গে মব সহিংসতা, গণপিটুনি, বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ, হেফাজত ও কারাগারে মৃত্যু, সীমান্তে হত্যা ও নির্যাতন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা এবং অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের মতো ঘটনাগুলো নাগরিকের জীবন, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের অধিকার নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

 

জুন মাসে সামাজিক সহিংসতার প্রকৃতিও নতুন মাত্রা লাভ করেছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা, গুজব ও উসকানিকে কেন্দ্র করে সংঘটিত মব সহিংসতা এবং বিচারবহির্ভূত সামাজিক প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ড সমাজে আইনের শাসনের দুর্বলতা ও দায়মুক্তির সংস্কৃতির প্রতিফলন হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। একই সময়ে রাজনৈতিক বিরোধ ও সংঘর্ষের কারণে প্রাণহানি, ব্যাপক আহত, সম্পত্তি ধ্বংস এবং জনজীবনে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক অংশগ্রহণের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

 

এ সময় নারী, শিশু ও শ্রমজীবী মানুষের মানবাধিকার পরিস্থিতিও গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ধর্ষণ, গণধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুকজনিত নির্যাতন, শিশু হত্যা ও নির্যাতনের ধারাবাহিকতা নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করেছে। একইভাবে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতার কারণে প্রাণহানি এবং গৃহকর্মীদের প্রতি নির্যাতনের ঘটনা শ্রম অধিকার বাস্তবায়নে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতির অভাবকে নির্দেশ করে।

 

বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত প্রকাশ, রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিষয়ে মন্তব্য এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কারণে মামলা, আটক, হামলা ও ভয়ভীতির ঘটনা একটি গণতান্ত্রিক সমাজে অবাধ মতপ্রকাশ ও তথ্যপ্রবাহের জন্য গুরুতর প্রতিবন্ধকতা হিসেবে বিবেচিত হয়। পাশাপাশি সীমান্তে প্রাণহানি, নির্যাতন এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় বিস্ফোরক ও স্থলমাইনের কারণে হতাহতের ঘটনা সীমান্ত নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

 

বাংলাদেশের ১৬ টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এর সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের জুন মাসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে নিন্মোক্ত তথ্য উঠে এসেছে:

 

 

 

রাজনৈতিক সহিংসতা

জুন মাসে কমপক্ষে ৫৮ টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৯ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৩৪৬ জন। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ ও হামলা, দলীয় ও অন্তকোন্দল, ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। জুন মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় হতাহতের সংখ্যা মে মাসের তুলনায় বেড়েছে । গত মে মাসে “রাজনৈতিক সহিংসতায়” নিহত হয়েছেন ০৫ জন এবং আহত হয়েছেন ২৮৯ জন।

জুন মাসে সহিংসতার অন্তত ৫৮ টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ২১ টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৪৬ জন ও নিহত ০৩ জন। ০৮ টি বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে নিহত ০২ জন ও আহত হয়েছেন ৩৬ জন, ১৪ টি বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে নিহত ০২ জন এবং আহত ১১৫ জন । ০৫ টি বিএনপি-এনসিপি মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৮ জন, ০৫ টি বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষে ০৯ জন আহত হয়েছেন। বিভিন্ন দলের মধ্যে ০৫ টি ঘটনায় নিহত ০২ জন ও আহত ২২ জন । নিহত ৯ জনের মধ্যে বিএনপির ৪ জন, আওয়ামী লীগের ২ জন, ছাত্র শিবিরের ১ জন, ইউপিডিএফের ১ জন ও ১ জন চরমপন্থী দলের সদস্য।

ক্রম

রাজনৈতিক দলসমূহ

ঘটনা

আহত

নিহত

বিএনপি- বিএনপি

২১

১৪৬

০৩

বিএনপি-জামায়াত

০৮

৩৬

০২

বিএনপি-আওয়ামী লীগ

১৪

১১৫

০২

বিএনপি-এনসিপি

০৫

১৮

০০

বিএনপি-অন্যান্য দল

০৫

০৯

০০

অন্যান্য দলের মধ্যে

০৫

২২

০২

মোট

৫৮

৩৪৬

০৯

 

এর পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ১২ টি ঘটনায় কমপক্ষে ২২ জন আহত এবং ০৯ জন নিহত হযেছেন। নিহতদের মধ্যে আওয়ামীলীগের ৩ জন, বিএনপির ৫ জন ও চরমপন্থী দলের সদস্য ১ জন। অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এছাড়াও সারাদেশে আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রীক ১৫ টি ঘটনায় অন্তত ৪৫ টি বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

 সভা-সমাবেশে বাঁধা

এ মাসে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপের একাধিক ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উক্ত সময়ে অন্তত ০৬ টি সভা ও সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা প্রদান করে, যার ফলে নির্ধারিত কর্মসূচি স্থগিত, ছত্রভঙ্গ অথবা বাতিল করতে বাধ্য হন আয়োজকরা। এই ধরনের হস্তক্ষেপের ফলে সংঘর্ষ ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং অন্তত ১৭ জন আহত ও ৩৬ জনকে আটক করা হয়েছে, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ পথচারীও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

 

সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানী

এটি উদ্বেগজনক যে, এ মাসে অন্তত ৩৯ টি নির্যাতনের ঘটনায় কমপক্ষে ৪৭ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সকল ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্ততপক্ষে ২৮ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ০৫ জন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ০৯ জন সাংবাদিক। ০৫ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। এছাড়া ০৭ টি মামলায় ১২ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। গত ১৫ জুন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বিরুদ্ধে ভুয়া, বিভ্রান্তিকর ও মানহানিকর তথ্য প্রচারের অভিযোগে ‘অগ্রযাত্রা প্রতিদিন’-এর সম্পাদকসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন বগুড়া প্রেসক্লাবের কোষাধ্যক্ষ তানভীর আলম। গত ২৩ জুন রাজধানীরে ধানমন্ডি-৩২ এর সামনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে কথা কাটাকাটির জেরে দৈনিক সকালের রিপোর্টার মাহফুজুর রহমান শিশিরকে ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগের দোসর বলে মারধর করে জামায়াতের নেতাকর্মীরা। এসময় আরও কয়েকজন সাংবাদিক হেনস্থার শিকার হন।

মত প্রকাশের স্বাধীনতা

এ মাসে মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এমাসে অন্তত ১১ টি ঘটনায় ১১ জনকে আটক ও ০৭ টি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় অন্তত ১২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান ও  ক্ষমতাসীন দল বিএনপির অন্যান্য নেতাকর্মীদের সমালোচনায় ০৬ জন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও কটুক্তির অভিযোগে ৫ জন এবং অন্যান্য ইস্যুতে ০১ জনকে আটক করা হয়েছে।  অন্যদিকে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫-এর বিভিন্ন ধারার অধীনে পৃথক ০৪ টি মামলায় ০৯ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া এসব ঘটনায় ০৪ জনকে আটক করা হয়েছে।

মব সহিংসতা ও গণপিটুনী

জুন মাসে গণপিটুনী ও মব সহিংসতার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ মাসে কমপক্ষে ৬৩ টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৩১ জন এবং আহত হয়েছেন ৬৯ জন। এছাড়া এ মাসে ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন, অভিযানে, আসামী ছিনতাই ও স্থানীয়দের মব সহিংসতায় সারাদেশে অন্তত ২৯ টি ঘটনায় ৬৬ জন আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বহিনীর সদস্য আহত হয়েছেন। গত ২১ জুন চট্টগ্রাম মহানগরের পলোগ্রাউন্ড মাঠ সংলগ্ন এলাকায় চুরির অভিযোগে অজ্ঞাত এক যুবককে পেটানোর পর বৈদ্যুতিক শক দিয়ে হত্যা করা হয়। এমনকি পুলিশ মরদেহ উদ্ধারে গেলে স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশের গাড়ি অবরোধ করে রাখে। গত ৩০ জুন সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার তোয়াকুল ইউনিয়নে একটি ছোট নৌকা চুরির অভিযোগে খালেদ আহমদ (২০) নামে এক যুবককে নির্জন বাড়িতে আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হয়। এমনকি নির্যাতনের একপর্যায়ে তার দুটি চোখই উপড়ে ফেলে তারা।

অজ্ঞাত লাশ 

জুন মাসে সারাদেশ নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থান হতে ৩২ টি অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে মাথা কাটা অবস্থায় ৩ টি, হাত পা বাধা অবস্থায় ৪ টি, অর্ধগলিত অবস্থায় ৫ টি লাশ পাওয়া গেছে, এছাড়াও শরীরে বিভিন্ন আঘাতের চিহ্নিরত অবস্থায় ৭ ও অন্যান্য পরিস্থিতিতে পাওয়া গেছে আরো ১৩ টি মরদেহ।

 

 

সংখ্যালঘু নির্যাতন

এটি উদ্বেগজনক যে, এ মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর কমপক্ষে  ১২ টি হামলার ঘটনায় ০৭ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া ১২ টি মন্দির, ১১ টি প্রতিমা ও ৭ টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এক নারী গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। গত ১৩ জুন বগুড়ার মোকামতলা উপচেলার কানছগাছি এলাকায় মহাশ্মশানের শিব মন্দির, কানছগাড়ি শীতলা মন্দির ও কালী মন্দিরের প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়েছে। এছাড়া ১৬-১৮ জুন তিন দিনের ব্যবধানে ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলায় দুইটি মন্দিরে হামলা ও প্রতিমা ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। গত ১৮ জুন খাগড়াছড়ির গুইমারায় মারমা সম্প্রদায়ের এক বিধবা নারীকে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাম থেকে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে নিয়ে গণ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।

সীমান্তে হত্যা ও নির্যাতন

জুন মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ০৫ টি ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হামলায় নিহত হয়েছেন ০২ জন এবং আহত হয়েছেন ০২ জন, যাদের মধ্যে ০৪ জনই গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এছাড়া ০১ জনকে আটক করা হয়েছে। জুন মাসে ঠাকুরগাঁও সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে কমপক্ষে ৭ জনকে পুশইন করা হয়েছে । এছাড়া, দেশের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে কমপক্ষে ৪১৬ জনকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। গত ২৫ জুন সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ সীমান্ত এলাকায় ভারতের অভ্যন্তরে মিক কন্দ দানী (৬০) নামে এক বাংলাদেশীর লাশ পাওয়া গেছে। গত ১২ জুন মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে মুজিব আলী (২০) নামে এক বাংলাদেশি তরুণ নিহত হয়েছেন। এর আগের দিন সন্ধ্যায় নিহত মুজিবসহ ৬ জন ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে, পরে বিএসএফ গুলে ছুড়লে মুজিব নিহত হন এবং বাকীরা পালিয়ে আসে।

অপরদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ০৩ টি সহিংসতার ঘটনায় ১২ জনকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে একজন রোহিঙ্গা যুবকসহ ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ০২ জুন বান্দরবানে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্তে পরিত্যক্ত মর্টারশেল বিস্ফোরণে সতনাইং তঞ্চঙ্গ্যা নামে ১২ বছরের এক কিশোর ও গত ২৪ জুন একই সীমান্তবর্তী ভালুকিয়া এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে মো. শফি আলম (৩০) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছেন। গত ৯ জুন একই সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে আব্দুল খালেক (৩০) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া গত ৬ জুন মিয়ানমারের অভ্যন্তরে বগারদিয়া এলাকায় মাছ ধরতে গেলে আরাকান আর্মির গুলিতে মো. আইয়ুব (২৮ ) নামে এক রোহিঙ্গা যুবক আহত হন।

বিচার বহির্ভূত হত্যা (হেফাজতে/নির্যাতনে/গুলি/বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যু)

দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, ভুক্তভোগীর পরিবার ও এইচআরএসএসের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে, হেফাজতে ও নির্যাতনে কমপক্ষে ৩ জন নিহত হয়েছে। যাদের মধ্যে ২ জন কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে, ও ১ জন ডিবি হেফাজতে নির্যাতনে নিহত হয়েছেন। এছাড়া আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর ধাওয়া খেয়ে গ্রেফতার এড়াতে পালাতে গিয়ে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ২১ জুন ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলায় ডিবি (গোয়েন্দা) পুলিশের হেফাজতে মির্জা ইস্তিয়াক আহমেদ প্রান্ত (২৬) নামে এক ছাত্রলীগ কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের দাবি, পুলিশের নির্যাতনের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ জুন খাগড়াছড়ির রামগড়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে গোলাগুলির সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে ববিন ত্রিপুরা (৩২) নামে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ-প্রসীত) সদস্য নিহত হন। গত ২৫ জুন খুলনার কয়রা উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় কোস্ট গার্ডের সঙ্গে কথিত ডাকাত ‘দুলাভাই বাহিনীর’ সদস্যদের বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে সাকাত সরদার (৬০) নামে এক ব্যক্তি নিহত হন।

কারা হেফাজতে মৃত্যু

এ মাসে সারাদেশে কারাগারে কমপক্ষে ৭ জন আসামী মারা গিয়েছেন। এর মধ্যে ০৪ জন জন কয়েদী ও ০৩ জন হাজতী। এর মধ্যে বিএনপির একজন, আওয়ামীলীগের একজন ও ৫ জন সাধারণ আসামী ছিলেন।  গত ২৪ জুন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে আটকের একদিন পর সাতকানিয়া উপজেলার ঢেমশা ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল আলম (৪২) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ঘটনার আগের দিনে ২৩ জুন বিকেলে একটি মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর নুরুল আলমকে কারাগারে আনা হয়। গত ১৮ জুন কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে শহিদুল্লাহ রাসেল (৪১) নামে এক যুবদল কর্মীর মৃত্যু হয়। তিনি একটি মাদক সংশ্লিষ্ট মামলায় কারাগারে বন্দী ছিলেন।

 

শ্রমিক নির্যাতন

জুন মাসে অন্তত ৫৫ টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১১ জন, আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৮৪ জন এবং গ্রেফতার করা হয়েছে ২৬ জনকে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় অন্তত ৩৯ জন শ্রমিক তাদের কর্মক্ষেত্রে মারা গেছেন। এছাড়া এ মাসে দুইজন গৃহকর্মীর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে এবং একজন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। গত ১৭ জুন রংপুর মহানগরীর কলেজ রোড়ের খামারপাড়া মোড় এলাকার একটি হোটেলে ময়লা পরিষ্কার করা নিয়ে কথা কাটাকাটির জেরে মো. শাওন (২৫) নামে এক কর্মচারীকে পিটিয়ে হত্যা করে দোকানের মালিক। গত ২০ জুন রাজধানীর ধানমন্ডি ৯/এ নম্বর রোডের একটি বহুতল ভবন থেকে পরে রিক্তা নামে ১১ বছর বয়সী এক শিশু গৃহকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, আগেই হত্যা করে উপর থেকে নিচে ফেলে দেওয়া হয়েছে। শিশুটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) একজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। গত ২০ জুন রাজধানীর ভাষানটেকের কচুক্ষেত এলাকায় বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি পোশাক কারখানা খুলে দেওয়া এবং বকেয়া বেতন–ভাতার দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় কয়েকজন শ্রমিককে মারধরের অভিযোগও উঠেছে। এছাড়া ঘটনাস্থল থেকে ২৬ শ্রমিককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অপরদিকে, গত ১৭ জুন খুলনা নগরীর সোনাডাঙ্গা আবাসিক মিলন দাস (২২) নামে এলাকায় পিতৃ-মাতৃহীন কিশোরী সোনাডাঙ্গা মডেল থানার উপসহকারী পরিদর্শক (এএসআই) সঞ্জয় মিত্র ও তার স্ত্রী পপি মিত্র কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ভুক্তভোগী গৃহকর্মী হিসেবে ছোটবেলা থেকেই পুলিশ দম্পতি বাসায় থাকতেন।

নারী ও শিশু নির্যাতন

জুন মাসে কমপক্ষে ৩৫২ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অন্তত ১০৬ জন, যাদের মধ্যে ৭৫ (৭১ %) জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, ১৯ জন নারী ও কন্যা শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ধর্ষণেরর পর ২ জন কন্যা শিশুকে হত্যা করা হয়েছে । ৯৪  জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন তন্মধ্যে শিশু ৪৯ জন। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৫৭ জন, আহত হয়েছেন ৪৮ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ৩৬ জন নারী। এছাড়া, যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত ৪, আহত ৪, এবং আত্মহত্যা করেছেন ২ জন নারী।  অন্যদিকে এসিড নিক্ষেপ ঘটনায় আহত হয়েছেন ১ জন নারী।

 

৪ জুন পারিবারিক সহিংসতায় চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় স্বামী কতৃক  সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূর শিখা খাতুন (১৯) পেটে লাথি মেরে গর্ভের সন্তান হত্যার ঘটনা ঘটে। ৬ জুন রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের হ্যাপি হোমস এলাকায় যৌতুকের দাবিতে  শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার জেসমিন আক্তার বিথী  (২৯) গৃহবধূর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। ৯ জুন মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় স্বামীকে আটকে রেখে দুই সন্তানের জননী এক গৃহবধূকে ধর্ষণ করা হয়। ৯ জুন কুমিল্লার তিতাস উপজেলায় সকাল ৮টার দিকে বেগম ফজিলাতুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ঢুকে দীর্ঘদিন ধরে উত্ত্যক্ত করা বখাটেদের দ্বারা স্কুলছাত্রী হীরামনির (১৪)  ওপর এসিড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। ১৫ জুন ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় কদম ফুল দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে নিখোঁজের কয়েক ঘণ্টা পর সংঘবদ্ধ  ধর্ষণে হত্যার শিকার  নিশামনি (৫) নামে এক শিশুর মরদেহ কংস নদী থেকে উদ্ধার করা হয়। ২৩ জুন রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় সানজিদা খাতুন (৯) নামে কিন্ডারগার্টেনের দ্বিতীয় শ্রেণির শিশুকে অশ্লীল ভিডিও দেখিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।  ২৫ জুন বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার কবাই ইউনিয়নের লক্ষ্মীপাশা গ্রামে যৌতুকের জন্য রিমা আক্তার মাহফুজা (৩০) নামে দুই সন্তানের জননীকে নির্যাতনের পর হত্যার ঘটনা ঘটে।

 

অন্যদিকে, এটি উদ্বেগজনক যে, জুন মাসে অন্তত ২৯১ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যাদের মধ্যে ৫৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ২৩৭ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

 

মামলা ও গ্রেফতার

এ মাসে সংঘটিত বিভিন্ন সহিংসতা ও রাজনৈতিক ঘটনায় কমপক্ষে ২২ টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় ৬২৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও প্রায় ১২৬২ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এছাড়া, একই মাসে রাজনৈতিক ও অন্যান্য মিলিয়ে মোট ২৫৭ টি ঘটনায় অন্তত ৪৭৭৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের অন্তত ১৫৫৯ জন, বিএনপির ৩৫ জন, এবং জামায়াতে ইসলামির ০২ জন সদস্য রয়েছেন। একই সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সারাদেশে যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়। শুধুমাত্র রাজধানীতে জুন মাসজুড়ে বিশেষ অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ২ হাজার ৩১৪ জনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, ১ মে থেকে ১০ জুন পর্যন্ত বিশেষ অভিযানে মোট ১৮,৩২৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি, যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দৃঢ় হয় এবং মানুষের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে গণপিটুনী ও মব সহিংসতা, রাজনৈতিক উত্তেজনা, এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ-এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। তাই “এইচআরএসএস” সরকারের প্রতি মানবাধিকার রক্ষায় আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছে এবং একই সাথে সকল নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ  ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতি অধিক সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানাচ্ছে।

Reports Files

No Data Found!