News Details
Child Rights Violence in Bangaldesh (from 2021 to 2026)
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)
বিশেষ প্রতিবেদন
বাংলাদেশে শিশু অধিকার লঙ্ঘন
২০২১ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬
ঢাকা | অক্টোবর ২০২৬
১. সারসংক্ষেপ
২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, অর্থাৎ পাঁচ বছর নয় মাসে (প্রায় ২,১০০ দিন), এইচআরএসএস বাংলাদেশে শিশুদের ওপর সহিংসতার ৮,৭২৫টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। এসব ঘটনায় ২,৫৯৮ শিশু নিহত এবং ১১,৪৫৮ শিশু আহত হয়েছে। এ ছাড়া ৩,৪৮৭টি শিশু ধর্ষণের ঘটনা, ১,৩৫৫টি শিশু যৌন হয়রানির ঘটনা এবং ধর্ষণের পর ১৩১ শিশু হত্যার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।
দৈনিক গড়ে প্রায় ৮ শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ বা হত্যার শিকার হয়েছে:
• দিনে গড়ে প্রায় ১.৭ শিশু ধর্ষণের শিকার,
• দিনে গড়ে প্রায় ১.২ শিশু নিহত,
• দিনে গড়ে প্রায় ৫.৫ শিশু আহত বা শারীরিক নির্যাতনের শিকার।
এই সংখ্যাগুলো কেবল এইচআরএসএস যা নথিভুক্ত করতে পেরেছে তা-ই প্রতিফলিত করে। প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই আরও বেশি।
২. পরিধি ও পদ্ধতি
তথ্যগুলো এইচআরএসএস জাতীয় দৈনিক পত্রিকা এবং নিজস্ব অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সংকলন করেছে। আন্তর্জাতিক আইন ও বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী যে কেউ শিশু হিসেবে গণ্য।
অর্থাৎ এখানে কেবল প্রকাশিত ও শনাক্তযোগ্য ঘটনা অন্তর্ভুক্ত। অনেক ঘটনা গণমাধ্যমে আসে না, তাই এই প্রতিবেদনের প্রতিটি সংখ্যাকে সর্বনিম্ন হিসাব হিসেবে দেখা উচিত, পূর্ণাঙ্গ হিসাব নয়।
৩. এক নজরে পরিসংখ্যান
৩.১ যৌন সহিংসতা
|
সূচক |
২০২১ |
২০২২ |
২০২৩ |
২০২৪ |
২০২৫ |
২০২৬* |
মোট |
|
মোট ধর্ষণ (নারী ও কন্যাশিশু) |
১,৮৩৩ |
১,২৮৪ |
৯৯৩ |
৫৫৮ |
৮২৮ |
৬৫৭ |
৬,১৫৩ |
|
শিশু ধর্ষণ |
১,০৪৭ |
৭৩২ |
৫৫৮ |
২৮৪ |
৪৭৪ |
৩৯২ |
৩,৪৮৭ |
|
মোট যৌন হয়রানি |
৫১৭ |
৫৩১ |
৪৫৯ |
৩২২ |
৪৩৪ |
৬৯৬ |
২,৯৫৯ |
|
শিশু যৌন হয়রানি |
২৩৫ |
২৫২ |
২২৬ |
১৩০ |
২৩৬ |
২৭৬ |
১,৩৫৫ |
|
ধর্ষণের পর নিহত শিশু |
২৮ |
১৭ |
২৮ |
২৩ |
১৭ |
১৮ |
১৩১ |
* ২০২৬ সালের তথ্য জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
৩.২ শারীরিক সহিংসতা ও হত্যা
|
সূচক |
২০২১ |
২০২২ |
২০২৩ |
২০২৪ |
২০২৫ |
২০২৬* |
মোট |
|
মোট ঘটনা |
১,৭২৫ |
১,৪১৫ |
১,৩৫২ |
১,০৫২ |
১,৩৭১ |
১,৮১০ |
৮,৭২৫ |
|
নিহত শিশু (মোট) |
২৫১ |
৩৭২ |
৫২৯ |
৬৬৪ |
২৮৮ |
৪৯৪ |
২,৫৯৮ |
|
আহত শিশু (মোট) |
১,৭৫২ |
১,২৩২ |
১,৬৫২ |
৪,৩৭৮ |
১,০৮৩ |
১,৩৬১ |
১১,৪৫৮ |
* ২০২৬ সালের তথ্য জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
৪. প্রধান পর্যবেক্ষণ
৪.১ ধর্ষণের শিকারদের অর্ধেকের বেশি শিশু
নথিভুক্ত ৬,১৫৩টি ধর্ষণের ঘটনার মধ্যে ৩,৪৮৭টিতে (৫৬.৭ শতাংশ) ভুক্তভোগী শিশু। এই হার উল্লেখযোগ্যভাবে স্থিতিশীল: ২০২১ সালে ৫৭.১ শতাংশ, ২০২২ সালে ৫৭.০ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৫৬.২ শতাংশ, ২০২৪ সালে ৫০.৯ শতাংশ, ২০২৫ সালে ৫৭.২ শতাংশ এবং ২০২৬ সালে ৫৯.৭ শতাংশ, যা পুরো সময়ে সর্বোচ্চ। সবচেয়ে কম ঘটনার বছরেও শিশু ভুক্তভোগীর অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি।
৪.২ ২০২৪ পর্যন্ত ধর্ষণের ঘটনা কমেছে, এরপর আবার বেড়েছে
নথিভুক্ত শিশু ধর্ষণ ২০২১ সালে ১,০৪৭ থেকে কমে ২০২৪ সালে ২৮৪-তে নেমেছিল, অর্থাৎ ৭৩ শতাংশ হ্রাস। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৪৭৪ হয়। ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসেই ৩৯২টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা মাসে গড়ে প্রায় ৪৪টি; ২০২৫ সালে ছিল প্রায় ৪০টি। একই গতি বজায় থাকলে বারো মাসে ২০২৬ সালের সংখ্যা প্রায় ৫২০ হবে, যা ২০২৫ সালের চেয়ে বেশি।
এইচআরএসএস সতর্ক করছে যে নথিভুক্ত ঘটনা কমা মানেই প্রকৃত ঘটনা কমা নয়। ঘটনা প্রতিবেদন, গণমাধ্যমের মনোযোগ এবং পরিবারগুলোর এগিয়ে আসার সাহস—সবই পরিসংখ্যানকে প্রভাবিত করে।
৪.৩ শিশু যৌন হয়রানি এই সময়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে
শিশু যৌন হয়রানির ২৭৬টি ঘটনা ২০২৬ সালের নয় মাসেই ২০২১ সালের পর যেকোনো পূর্ণ বছরের চেয়ে বেশি। ২০২৬ সালে মোট নথিভুক্ত যৌন হয়রানি (৬৯৬) ২০২৪ সালের (৩২২) দ্বিগুণেরও বেশি। দুটিই এ বছর তীব্র ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা নির্দেশ করে।
৪.৪ ধর্ষণের পর নিহত শিশু
অন্তত ১৩১ শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে, যা নথিভুক্ত শিশু ধর্ষণের প্রায় ৩.৮ শতাংশ। বার্ষিক সংখ্যা সারা সময়ে ১৭ থেকে ২৮-এর মধ্যে থেকেছে; টেকসই কোনো হ্রাস দেখা যায়নি।
৪.৫ ২০২৪ ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী ও সর্বাধিক আহত হওয়ার বছর
২০২৪ সালে মোট ঘটনা ছিল সবচেয়ে কম (১,০৫২), কিন্তু নিহত (৬৬৪) ও আহত (৪,৩৭৮) শিশুর সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ। অর্থাৎ ওই বছরের ঘটনাগুলো গড়ে অনেক বেশি প্রাণঘাতী ছিল: প্রতি ঘটনায় প্রায় ০.৬৩ শিশু নিহত, ২০২১ সালে যা ছিল প্রায় ০.১৮। এইচআরএসএস মনে করে এটি ওই বছরের জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেন্দ্রীক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ব্যাপক সহিংসতার প্রতিফলন, তবে এটিকে সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপনের আগে ঘটনাভিত্তিক তথ্যের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
৪.৬ হত্যার সংখ্যা আবার ২০২৪ সালের স্তরের দিকে
২০২৫ সালে ২৮৮-তে নামার পর ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে শিশু হত্যা বেড়ে ৪৯৪ হয়েছে, মাসে গড়ে প্রায় ৫৫। এটি ২০২৪ সালের (মাসে প্রায় ৫৫) প্রায় সমান এবং ২০২৫ সালের হারের (মাসে ২৪) দ্বিগুণেরও বেশি। ২০২৬ সালে মোট ঘটনা (১,৮১০) ইতোমধ্যে পুরো সময়ের যেকোনো বছরের চেয়ে বেশি এবং বর্তমান গতিতে পুরো বছরে প্রায় ২,৪০০-এর কাছাকাছি পৌঁছাবে।
৪.৭ দৈনিক চিত্র
|
সূচক |
মোট (২০২১–সেপ্টেম্বর ২০২৬) |
দৈনিক গড় |
|
শিশু ধর্ষণ |
৩,৪৮৭ |
প্রায় ১.৭ |
|
নিহত শিশু |
২,৫৯৮ |
প্রায় ১.২ |
|
আহত বা শারীরিক নির্যাতনের শিকার শিশু |
১১,৪৫৮ |
প্রায় ৫.৫ |
|
সর্বমোট |
১৭,৫৪৩ |
প্রায় ৮ |
গড় হিসাব প্রায় ২,১০০ দিনের ভিত্তিতে।
৫. সুপারিশ
এইচআরএএস শিশুর অধিকার নিশ্চিতে নিম্নোক্ত পরামর্শ প্রদান করছেঃ
১. দ্রুত ও ন্যায্য বিচার। শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ও দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া গঠন ও পর্যাপ্ত সম্পদ নিশ্চিত করা।
২. ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর সুরক্ষা। মামলা প্রত্যাহারের চাপ বন্ধ করতে শিশু ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা।
৩. শিশুবান্ধব তদন্ত। পুলিশ, চিকিৎসক ও প্রসিকিউটরদের শিশু-সংবেদনশীল পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং সময়মতো ডাক্তারি পরীক্ষা ও আলামত সংরক্ষণ নিশ্চিত করা।
৪. অভিযোগ ও রেফারেল ব্যবস্থা জোরদার করা। সহজলভ্য হেল্পলাইন, ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার ও কমিউনিটি পর্যায়ে অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা এবং স্বাস্থ্য, আইনি ও মনোসামাজিক সেবার সঙ্গে স্পষ্ট রেফারেল পথ তৈরি করা।
৫. প্রতিরোধ ও সচেতনতা। বিদ্যালয়ে শরীরের নিরাপত্তা ও অধিকার বিষয়ক শিক্ষা চালু করা এবং গ্রামাঞ্চলসহ অভিভাবক ও সম্প্রদায়ভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা।
৬. পুনর্বাসন। ভুক্তভোগী শিশুদের মনোসামাজিক সহায়তা, শিক্ষা অব্যাহত রাখা এবং আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা।
৭. উন্নত তথ্যব্যবস্থা। সরকারি সংস্থাগুলোর উচিত শিশু সুরক্ষা বিষয়ে বিস্তারিত (বয়স, লিঙ্গ, জেলা, অপরাধীর সঙ্গে সম্পর্ক, মামলার অবস্থা) ও নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করা, যাতে নাগরিক সমাজের নথিভুক্তকরণই একমাত্র উৎস না থাকে।
৭. তথ্য-টীকা ও সীমাবদ্ধতা
• ২০২৬ সালের তথ্য শুধু জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এই প্রতিবেদনের আনুপাতিক হিসাবগুলো ইঙ্গিতমূলক, পূর্বাভাস নয়।
• তথ্য গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণ ও এইচআরএসএসের অনুসন্ধান থেকে নেওয়া এবং সম্ভবত প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে কম।
• “মোট ধর্ষণ” বিভাগে নারী ও কন্যাশিশু উভয়ই অন্তর্ভুক্ত; শিশুদের ঘটনা এর অংশ।
• “মোট ঘটনা” বলতে শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনার সংখ্যা বোঝানো হয়েছে; নিহত ও আহতের সংখ্যা শিশুর সংখ্যা, ঘটনার নয়।
৮. উপসংহার
এইচআরএসএস সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচার বিভাগ, নাগরিক সমাজ ও সম্প্রদায়ের প্রতি শিশু সুরক্ষাকে জরুরি জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানাচ্ছে এবং শিশু অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নথিভুক্ত ও প্রকাশ করা অব্যাহত রাখবে।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস), ঢাকা
