News Details
Human Rights Situation in Bangladesh (September 2024 – January 2026)
মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন
বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি (সেপ্টেম্বর ২০২৪-জানুয়ারী ২০২৬)
গত ১৭ মাসে বাংলাদেশের মানুষ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সাক্ষী হয়েছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ফলে দায়িত্ব পাওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ৬ টি সংস্কার কমিশন গঠন এবং পরবর্তীতে ঐক্যমত্য কমিশন গঠন করে। যাঁরা দীর্ঘদিন সক্রিয় রাজনৈতিক দলসমূহের সাথে বৈঠক করে বাংলাদেশ পূনর্গঠনে জুলাই সনদ প্রনয়ণ করেন। সেইসাথে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদের বিষয়ে গণভোটের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। বর্তমান সরকার বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা ও মানবাধিকার উন্নয়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। পৃথক বিচার বিভাগ সচিবালয় প্রতিষ্ঠার অধ্যাদেশ জারি, মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ও পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী অধ্যাদেশ জারি, গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর উল্লেখযোগ্য।
মানবাধিকার উন্নয়নে বর্তমান সরকার কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় নগন্ন। ফলে গত ১৭ মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে মানবাধিকার পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র ছিল উদ্বেগজনক। নাগরিকের মানবাধিকার লংঘন প্রতিরোধে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা, সরকারের কার্যকর ভূমিকার অভাব, এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক দলসমূহের দায়িত্বহীনতা ও উদাসীনতার কারনে গত ১৭ মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল হতাশাজনক। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পেরোলেও মানুষের প্রত্যাশিত জীবনমান, অধিকার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বাস্তবায়িত হয়নি। বাংলাদেশের মানুষের কাছে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, মানবাধিকার, ও গণতন্ত্রের প্রকৃত প্রতিষ্ঠা এখনো স্বপ্নই রয়ে গেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার সহস্রাধিক জীবনের বিনিময়ে অর্জিত গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে মানবাধিকার পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের প্রত্যাশা থাকলেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের পূর্বের ধারা অব্যাহত থাকার পাশাপাশি এতে নতুন কিছু ধারাও যুক্ত হয়েছে।
সেপ্টেম্বর ২০২৪-জানুয়ারী ২০২৬, গত ১৭ মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, গুমের ঘটনা না ঘটলেও রাজনৈতিক সহিংসতা, মব সহিংসতা, গণপিটুনিতে নির্যাতন ও হত্যা, হেফাজতে ও নির্যাতনে মৃত্যু, নারী নিপীড়ণ ও ধর্ষণ, সীমান্ত হত্যা, মাজারে হামলা ও ভাঙচুর, এবং সংবাদ মাধ্যম ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা বৃদ্ধি পেয়েছে। বাক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, শিশু নির্যাতন, সংখ্যালঘু নির্যাতন, কারাগারে মৃত্যু, শ্রমিকদের উপর হামলা, সভা-সমাবেশে বাধা প্রদানের ঘটনা নিয়মিত ঘটেছে। এসময়ে চাঁদাবাজি, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, ও হত্যাসহ বেশ কিছু সামাজিক অপরাধ ঘটেছে যা জনমনে ভয় ও আতঙ্ক তৈরি করেছে। সাবেক স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার বক্তব্য নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের ভার্চ্যুয়াল অনুষ্ঠানে প্রচারের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা ৫, ৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে অবস্থিত শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি, শেখ হাসিনার বাসভবন সুধা সদন এবং সারা দেশে বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের অফিস ও নেতাদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। গত ১২ মে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গত বছর আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সব সংগঠনের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘর্ষ শিক্ষার্থীদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। রাজধানীতে বিভিন্ন দাবি আদায়ে রাস্তা বন্ধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। আদালত ও কারা ফটকে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের উপর হামলা; থানা ও পুলিশের ওপর হামলা করে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টদের আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে, যেখানে রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। দেশে সন্ত্রাসবাদ দমন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনতে যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নামে ও বিশেষ অভিযানে বেশ কিছু অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া, বিএসএফ কর্তৃক ভারতীয় বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বাংলাভাষী মানুষদেরকে পুশইন করা, এমনকি নিরীহ বাংলাদেশিকে হত্যা, আহত ও গ্রেফতার এবং মিয়ানমারের আরাকান আর্মি কতৃক বাংলাদেশি জাহাজ ও জেলেদের আটক, সীমান্তে গুলি, মাইন ও মর্টারশেল বিস্ফোরণের মত বিভিন্ন ঘটনা মানবাধিকার পরিস্থিতির বিষয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
১৬ জুলাই, ২০২৫ তারিখে গোপালগঞ্জে এনসিপির ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি কেন্দ্রিক স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সাথে যৌথ বাহিনীর সংঘর্ষে ও গুলিতে ৫ জন নিহত এবং শতাধিক আহত হয়েছেন। রংপুরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে এক কিশোরকে গ্রেপ্তারের পর উগ্র-উত্তেজিত জনতা সংগঠিতভাবে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্তত ২০ টি বাড়িতে বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছে। পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (মিটফোর্ড) সামনে ৯ জুলাই ২০২৫ তারিখে জনসম্মুখে ব্যবসায়ী মোঃ সোহাগকে যেভাবে নির্মমভাবে পিটিয়ে, কুপিয়ে এবং শরীর থেঁতলে হত্যা করা হয়েছে—যা অত্যন্ত বর্বর এবং উদ্বেগজনক। গত ২১ জুলাই ঢাকার উত্তরা এলাকায় অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি যুদ্ধ প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনায় পাইলটসহ অন্তত ৩৭ জন নিহত এবং দেড় শতাধিক মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই শিশু শিক্ষার্থী।
১৫ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২-এ শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে বেশ কয়েকজন হেনস্থা ও গনপিটুনির শিকার হয়েছেন। ২৯ আগস্ট রাজধানীর কাকরাইল বিজয়নগরে জাতীয় পার্টি কার্যালয়ের সামনে গণঅধিকার পরিষদের সাথে জাতীয় পার্টির সংঘর্ষের পর গণঅধিকার পরিষদের কর্মসূচিতে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর হামলায় সাবেক ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুরসহ বেশ কয়েকজন নেতা-কর্মী মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। এই ঘটনার জেরে ৩০ আগস্ট রাজধানীর কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এছাড়াও দেশের কয়েকটি জেলায় জাতীয় পার্টির অফিসে হামলা, ভাঙচুর ও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। গত সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ি জেলার গুইমারা এলাকায় সংঘটিত ভয়াবহ সহিংস ঘটনায় তিনজন পাহাড়িকে হত্যা, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপর হামলা এবং রামেসু বাজারের শতাধিক ঘর ও দোকানপাট অগ্নিসংযোগে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়াও ডাকসু, জাকসু, চাকসু, জকসু ও রাকসু নির্বাচন কেন্দ্রিক নারী প্রার্থীরা সোসাল মিডিয়ায় ভয়াবহ বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন।
এটা অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা যে, গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টন-বিজয়নগর এলাকায় সন্ত্রাসীরা দিন দুপুরে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির মাথায় গুলি করলে তিনি গুরুতরভাবে আহত হয়েছিলেন। গত ১৮ ডিসেম্বর তিনি এক সপ্তাহের দীর্ঘ জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ের পর সিংগাপুরের একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। ওসমান হাদি একজন চিন্তাশীল রাজনৈতিক ব্যক্তি, গণঅভ্যুত্থানের একজন গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর এবং আসন্ন নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা করছিলেন। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক যে, গত ১৮ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে শরিফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সংঘবদ্ধ আক্রমণকারীরা রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো ও কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউতে ডেইলি স্টার-এর কার্যালয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায় এবং আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। একইসাথে তারা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট ও উদীচী কার্যালয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এটি উদ্বেগজনক যে, গত ১৮ ডিসেম্বর রাতে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার জামিরদিয়া ডুবালিয়াপাড়া পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেড কারখানার সামনে হযরত মুহাম্মদ (সা.) কে নিয়ে কটুক্তির মিথ্যা অভিযোগে দিপু চন্দ্র দাস (২৭) নামে এক পোশাক শ্রমিককে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যার পর উচ্ছৃঙ্খল জনতা নিহতের লাশ এক কিলোমিটার দূরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের একটি গাছে ঝুলিয়ে পেট্রোল দিয়ে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে দেয় ।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দলীয় ও আভ্যন্তরীণ সহিংসতা, অন্তর্কোন্দল, দলীয় আধিপত্য বিস্তার ও রাজনৈতিক বিরোধের কারণে সংঘর্ষ, নারী কর্মীদের উপর হামলা ও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার মাত্রা অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষত নির্বাচনী পরিবেশ ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি হামলা, ভীতি প্রদর্শন, বাধা সৃষ্টি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এমনকি আধিপত্য বিস্তার ও রাজনৈতিক বিরোধের কারণে প্রাণহানি ও হতাহতের ঘটনা বহুমাত্রিক সংকট ও উদ্বেগের ইঙ্গিত বহন করে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন পড়তে নিচের ফাইল এ দেখুন
