News Details
Quarterly Human Rights Report (July-September 2026)
বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি জুলাই-সেপ্টেম্বর, ২০২৬
‘এইচআরএসএস’ এর ত্রৈমাসিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন
২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি রাজনৈতিক সহিংসতা, জননিরাপত্তার অবনতি, নাগরিক স্বাধীনতার চর্চা, মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, নারী ও শিশুর সুরক্ষা, শ্রম অধিকার এবং সীমান্ত নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এ সময়ে রাজনৈতিক ও আন্তঃদলীয় সংঘর্ষ, দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব, স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, সভা-সমাবেশে বাধা, সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হয়রানি, মব সহিংসতা, কিশোরগ্যাংয়ের তৎপরতা, অপহরণ, হেফাজতে ও কারাগারে মৃত্যু, সীমান্তে হতাহত এবং নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার নানা অভিযোগ ও ঘটনা সামনে এসেছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান, গ্রেপ্তার ও মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, ন্যায়বিচার, নাগরিক স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
পর্যালোচনাধীন সময়ে রাজনৈতিক বিরোধ, আন্তঃদলীয় সংঘর্ষ, দলীয় অন্তর্কোন্দল, স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিষ্ঠাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রাণহানি, আহত হওয়ার পাশাপাশি হামলা, ভাঙচুর ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা, সমাবেশ ও সাংগঠনিক কর্মসূচিতেও বাধা প্রদান ও হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। এ ধরনের পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, সংগঠন ও সমাবেশের স্বাধীনতা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। রাজনৈতিক পরিচয় বা মতাদর্শ নির্বিশেষে সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডসংশ্লিষ্ট গ্রেপ্তার ও মামলার ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট আইনি ভিত্তি, আইনজীবীর সহায়তা ও কার্যকর বিচারিক তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা জরুরি।
মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি পরিলক্ষিত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত প্রকাশ, ভিন্নমত চর্চা ও সমালোচনার জেরে মামলা, আটক ও হয়রানির অভিযোগের পাশাপাশি সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি, লাঞ্ছনা ও আটকের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা স্বাধীন সাংবাদিকতা, তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবাধ আলোচনা ও সমালোচনার পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং শান্তিপূর্ণ মতপ্রকাশের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য বজায় রেখে আইন প্রয়োগ, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধাহীন পরিবেশ সৃষ্টি করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক বিরোধ, দলীয় আধিপত্য বিস্তার ও সাংগঠনিক দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়া, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি তোলারাম কলেজসহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহিংসতামুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহিতা এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত সময়কালে মব সহিংসতা, গণপিটুনি, কিশোরগ্যাংয়ের তৎপরতা, অপহরণ, হামলা এবং অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারের মতো ঘটনা জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অপরাধের অভিযোগে কাউকে আইনবহির্ভূতভাবে শাস্তি দেওয়া, গণপিটুনি বা সহিংসতার মাধ্যমে বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী। এসব ঘটনা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা, অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং হামলাকারী, উসকানিদাতা ও সহযোগীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।
এ ছাড়া জমি দখল, চাঁদাবাজি ও স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ও সহিংসতার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেপ্টেম্বরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুর; সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা ও লুটপাট; এবং আশুলিয়ার শ্রীপুরে মাদ্রাসা ট্রাস্টের নিয়ন্ত্রণ ও মার্কেট দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সম্পত্তির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এসব ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ক্ষয়ক্ষতি ও ঘটনার প্রকৃতি নিরূপণ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান, গ্রেপ্তার ও আটক-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। আটক ব্যক্তির মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষা, আইনজীবীর সহায়তা লাভের সুযোগ এবং দ্রুত ও কার্যকর বিচারিক তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে হেফাজতে ও কারাগারে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনা স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্তের আওতায় আনা, বন্দিদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা প্রদান এবং নিরাপদ ও মানবিক কারা-পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা আইন প্রয়োগকারী ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থা সুদৃঢ় করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সীমান্ত এলাকায় গুলিবর্ষণ, নির্যাতন, স্থলমাইন বিস্ফোরণ ও হতাহতের বিভিন্ন ঘটনা সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর জীবন, নিরাপত্তা ও চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সীমান্তে প্রাণহানি ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও পরিবারের জন্য কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বেসামরিক মানুষের জীবন ও মর্যাদার সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
গত তিন মাসে নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ, গণধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুক-সংশ্লিষ্ট নির্যাতন, নারী হত্যা ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা অব্যাহত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনা নারী ও শিশুর জীবন, শারীরিক অখণ্ডতা, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জকে তুলে ধরে। ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সহায়তা, সুরক্ষিত অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অপরাধ প্রতিরোধ, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ভুক্তভোগীকে দোষারোপ ও সামাজিক কলঙ্ক আরোপের প্রবণতা রোধে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
শ্রম অধিকার ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও শ্রমিকের মৃত্যু, নির্যাতন, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা এবং গৃহকর্মীদের ওপর সহিংসতার অভিযোগ উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। শ্রমিক ও গৃহকর্মীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য আচরণ, মর্যাদা এবং কার্যকর প্রতিকার লাভের অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, মৃত্যু ও নির্যাতনের অভিযোগের কারণ অনুসন্ধান, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও পরিবারের জন্য উপযুক্ত প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।
এই সময়ে সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ড, কলকাতায় হোটেলে অগ্নিকাণ্ড এবং ভূমধ্যসাগরে অভিবাসনপ্রত্যাশী বাংলাদেশিদের মৃত্যুর ঘটনা নিরাপদ অভিবাসন ও বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের সুরক্ষার বিষয়টি সামনে এনেছে। এসব ঘটনা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নিরাপত্তা, মানব পাচার প্রতিরোধ এবং বিদেশে বিপদগ্রস্ত নাগরিকদের দ্রুত সহায়তা প্রদানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনপথ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রতারণা ও পাচার প্রতিরোধ, সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় এবং বিপদগ্রস্ত নাগরিকদের উদ্ধার ও তাঁদের পরিবারের সহায়তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ১৬ টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এর সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর এই ত্রৈমাসিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে নিন্মোক্ত তথ্য উঠে এসেছে:
রাজনৈতিক সহিংসতা
গত তিন মাসে কমপক্ষে ১৮৩ টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১৭ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১২২৭ জন। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, দলীয় ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন, দখলদারিত্ব এবং চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় বাড়িঘর, যানবাহন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর পৃথক হামলা ও গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা এবং দেশের অনেক জায়গায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের কারণে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে ।
গত তিন মাসে সহিংসতার ১৮৩ টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ৬৯ টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৫৪০ জন ও নিহত ০৯ জন। ৩১ টি বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৩৩৮ জন ও নিহত ০১ জন, ১৬ টি বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৮১ জন এবং নিহত হয়েছেন ২ জন। ১৪ টি বিএনপি-এনসিপি মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৭০ জন, ১টি আওয়ামীলীগের মধ্যে অন্তর্কোন্দলে নিহত হয়েছেন ১ জন, ৩১ টি বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৬৯ জন। এছাড়া, বিভিন্ন দলের মধ্যে ১৯ টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ১২৬ জন এবং নিহত হয়েছেন ০৩ জন।
১৮৩ টি সহিংসতার ঘটনার ১৬১ টিই (৮৮%) ঘটেছে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ও বিএনপির সাথে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে। নিহত ১৭ জনের মধ্যে বিএনপির ৯ (৫৩%) জন, জামায়াতের ২ জন, আওয়ামীলীগের ৩ জন এবং অন্যান্য ৩ জন।
এর পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ২৩ টি ঘটনা ঘটেছে। এসকল হামলায় কমপক্ষে ১০ জন আহত এবং বিএনপির ১০ জন, আওয়ামীলীগের ২ জন, জামায়াতের ১ জন ও অন্যান্য দলের ১ জনসহ মোট ১৪ জন নিহত হয়েছেন। এ সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ৪২ রাজনৈতিক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলায় আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, নির্বাচনী সহিংসতা, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রীক ৫১ টি ঘটনায় কমপক্ষে ১৫৩ এর অধিক বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠা, দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
|
ক্রম |
রাজনৈতিক দলসমূহ |
সংঘর্ষের ঘটনা |
আহত |
নিহত |
|
১ |
বিএনপি- বিএনপি |
৬৯ |
৫৪০ |
৯ |
|
২ |
বিএনপি-জামায়াত |
৩১ |
৩৩৮ |
১ |
|
৩ |
বিএনপি-আওয়ামী লীগ |
১৬ |
৮১ |
২ |
|
|
আওয়ামীলীগ- জামায়াত |
২ |
৩ |
১ |
|
৪ |
বিএনপি-এনসিপি |
১৪ |
৭০ |
|
|
৬ |
বিএনপি-অন্যান্য দল |
৩১ |
৬৯ |
|
|
৭ |
আওয়ামীলীগ-আওয়ামীলীগ |
১ |
|
১ |
|
৮ |
অন্যান্য দলের মধ্যে |
১৯ |
১২৬ |
৩ |
|
মোট |
১৮৩ |
১২২৭ |
১৭ |
|
উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে, গত ১৯ জুলাই কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার ঘোড়াউত্রা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে কাছুম আলী(৬৫) নামে এক বিএনপি নেতা নিহত হয়েছে। তিনি ছাতিরচর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সহসভাপতি। জানা যায়, বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে বিএনপি নেতা কাছুম আলী ও যুবদল নেতা জুম্মনের মধ্যে বিরোধ শুরু চলছিলো। ঘটনার দিন যুবদলনেতা জুম্মনের নেতৃত্বে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছিল, তাতে বিএনপি নেতা কাছুম আলীসহ অন্যান্যরা বাঁধা দেওয়াও ঘটনাটি সংঘর্ষে রূপ নেয়। পরে মধ্যরাতে যুবদল নেতা জুম্মনের নেতৃত্ব হামলা চালানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই কাসুম আলী মারা যান। গত ১৮ সেপ্টেম্বর নেত্রোকোনার খালিয়াজুরিতে পুরোনো বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিএনপি উপজেলার চাকুয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আব্দুর রহমান ও ইউনিয়ন শ্রমিক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লিগেল মিয়ার অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ২৮ জন আহত হন। এর মধ্যে শাহ আলমগীর (২২) নামে এক যুবক গুরুতর আহত হলে ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আলমগীরের মৃত্যু হয়। এছাড়া, গত ১০ সেপ্টেম্বর ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার ভায়না ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড সভাপতি মোনায়েম হোসেনকে (৪৮) কুপিয়ে হত্যা করে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা।
নির্বাচনী সহিংসতা
২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত সময়কালে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীতা ঘোষণা ও জনমত তৈরিকে কেন্দ্র করে দেশের কয়েকটি জেলায় সহিংসতা, সংঘর্ষ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন-পূর্ব সময়ে রাজনৈতিক দলসমূহের সম্ভাব্য প্রার্থী বা তাদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা গেছে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
উল্লেখিত তিন মাসে নির্বাচনকেন্দ্রিক অন্তত ৬ টি সহিংসতার ঘটনায় কমপক্ষে ৪৫ জন আহত হয়েছেন। সহিংসতার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং পারস্পরিক সংঘর্ষ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ৪ টি ঘটনায় অন্তত ৩৬ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে ২টি ঘটনায় অন্তত ৯ জন আহত হয়েছেন।
উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে, গত ২৬ জুলাই বরিশালের হিজলা উপজেলায় আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষ হয়। আসন্ন ইউপি নির্বাচনে গৌরবদী ইউনিয়নের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক ফরিদ উদ্দীন ব্যাপারী এবং উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আলতাফ হোসেন খোকনের অনুসারী এবং জেলা ছাত্রদলের সাবেক সদস্য ইসমাইল মোল্লার সমর্থকদের মধ্যে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে ফরিদ উদ্দীন ব্যাপারীসহ অন্তত ১০ নেতাকর্মী আহত হন। গত ৫ আগস্ট কুষ্টিয়ার খোকসা পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মেয়র প্রার্থী ও খোকসা উপজেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাফিজ আহমেদ খান রাজুর ওপর সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। খোকসা থানাপাড়া এলাকায় নিজ বাড়ির গেটের সামনে সংঘটিত এ হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। হামলার সময় ব্যাপক গুলিবর্ষণ ও ককটেল বিস্ফোরণের ফলে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া, গত ১১ আগস্ট সাতক্ষীরার তালা উপজেলার নগরঘাটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী এবাদুল ইসলামের ওপর সশস্ত্র হামলার অভিযোগ পাওয়া যায়। হামলায় প্রার্থী এবাদুল ইসলামসহ অন্তত আটজন কর্মী-সমর্থক আহত হন। ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, নগরঘাটা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মহব্বত হোসেন এবং সাংগঠনিক সম্পাদক আক্তারের নেতৃত্বে ছাত্রদল নেতা লাকি, রায়হান, সাকিব ও যুবদলের নেতাকর্মীরা এ হামলায় জড়িত ছিলেন।
সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানি
এটি উদ্বেগজনক যে, এই সময়ে সাংবাদিকদের উপর অন্তত ৮৮ টি হামলার ঘটনায় কমপক্ষে ১৩৫ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সকল ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্ততপক্ষে ৬৩ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ২৭ জন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ১৮ জন সাংবাদিক। ৯ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। এছাড়া সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৬ এর অধীনে ১৮ জন সাংবাদিককে আসামী করে ৪ টি মামলা হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে, গত ১৬ জুলাই হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এর কার্যালয়ে অবৈধ সিলিকা বালু উত্তোলন ও মাদক কারবারের সংবাদ প্রকাশের জেরে দৈনিক ইনকিলাব ও এনপিবি নিউজ -এর বাহুবল উপজেলা প্রতিনিধি হাবিবুর রহমান নোমান ও সাংবাদিক গোলাম মোস্তফা সৈবালের উপর হামলা চালানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বাহুবল উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আব্দুর রকিবসহ কয়েকজন এ হামলা চালান। গত ২৮ জুলাই পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আসাদুজ্জামান সুমন আজকের বসুন্ধরার সাংবাদিক লালন সরকারকে বেধড়ক মারধর করে। এমনকি মারধরের পর ভুক্তভোগী সাংবাদিককে থানায় হস্তান্তর ও চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের অভিযোগ।
গত ২৫ আগস্ট শরীয়তপুরে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের ক্যাম্পাসে সকালে ডেইলি স্টারের সাংবাদিক জাহিদ হাসান, নিউজ টুয়েন্টিফোর টেলিভিশন ও জাগো নিউজ প্রতিনিধি বিধান মজুমদার ও মানবকণ্ঠের জেলা প্রতিনিধি বরকত মোল্লাকে মারধর করা করা হয়। এমনকি মারধরের বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে আরেক সাংবাদিককে হুমকি দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘তোমরা লেখবা, আমরা পিডামু।’ গত ২৫ আগস্ট যশোরের শার্শা উপজেলার নাভারণ বুরুজবাগান উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে অ্যাডহক কমিটির সভা চলাকালীন সময় তথ্য সংগ্রহ করতে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছেন স্থানীয় পাঁচজন সাংবাদিক। হামলার শিকার পাঁচ সাংবাদিক হলেন- আনিসুর রহমান, আলমগীর হোসেন, সাহাবুদ্দিন আহম্মেদ, আতিকুজ্জামান রিমু ও রাহাত হোসেন। এছাড়া, গত ২০ সেপ্টেম্বর যশোরের কেশবপুর প্রেসক্লাবে হামলা চালিয়ে ‘মব’ সৃষ্টি করে ক্লাব দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এসময়ে প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক লোক সমাজ-এর কেশবপুর প্রতিনিধি জয়দেব চক্রবর্তী, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক কল্যাণ-এর কেশবপুর প্রতিনিধি আবদুল্লাহ আল ফুয়াদ এবং নির্বাহী সদস্য ও দৈনিক সময়ের খবর-এর কেশবপুর প্রতিনিধি মেহেদী হাসান জাহিদসহ কয়েকজন সাংবাদিক আহত হয়েছেন।
মত প্রকাশের স্বাধীনতা
গত তিন মাসে সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬ এর বিভিন্ন ধারার অধীনে পৃথক ১০ টি মামলায় ৩২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে ১১ জনকে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানক নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দেওয়ায় ৮ জনকে আটক করা হয়েছে এবং অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যক্তির সমালোচনায় আটক ৩ জন ও ৩ টি মামলা হয়েছে। এছাড়া ৭ জনকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও কুরআন অবমাননার অভিযোগে আটক করা হয়েছে, এসব ঘটনায় ৭ টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। চলমান রাজনৈতিক ইস্যু, জুলাই ইস্যু, মাদক, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, মানহানিকর কন্টেন্ট তৈরি ও কটূক্তির অভিযোগে ৩ জনকে হত্যা ও ২ জনকে নির্যাতন ও ৬ জনকে চাকরীচ্যুত করা হয়েছে। এছাড়া ১৫ জনকে সাইবার বুলিং, ফেসবুকে সমালোচনা ও কটূক্তির অভিযোগে আটক করা হয়েছে ।
গত ১৫ জুলাই ‘আবদুল কদ্দুস মাখন’ নামে একটি ফেসবুক থেকে জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমকে কটুক্তি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একটি পোস্ট শেয়ার করার অভিযোগে ময়মনসিংহের নান্দাইলে সুমন নামে এক যুবলীগ নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তিকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে করা সাইবার সুরক্ষা আইনের মামলায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিবের পদ থেকে সাময়িক অব্যাহতি পাওয়া গাজী সালাউদ্দিন তানভীরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। জানা গেছে, বগুড়া সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাফতুন আহমেদ খান রুবেলের দায়ের করা মামলায় গাজী সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। ওই মামলার ভিত্তিতেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে। এছাড়া, গত ৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য ও লেখালেখির অভিযোগে গাজীপুরে গাজীপুর মহানগরীর গাছা এলাকা থেকে সিফাত আব্দুল্লাহ নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। জানা যায়, বিদ্যুৎ বিলের বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও বার্তায় কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দেন। এ ঘটনায় তাকে আটক দেখানো হলেও সমালোচনার মুখে নতুন কোন মামলা না হলেও পূর্বের একটি সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা মামলায় তাকে আটক দেখানো হয়।
মব সহিংসতা ও গণপিটুনী
গত তিন মাসে সারাদেশ চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাক-বিতন্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননা, ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টাসহ নানা অভিযোগে গণপিটুনী ও মব সহিংসতার কমপক্ষে ১৩৭ টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৫৪ জন এবং আহত হয়েছেন ১৪৫ জন।
উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে, গত ৬ আগস্ট টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে জামুর্কি পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের সাব-স্টেশন অফিসে হামলা চালায় স্থানীয়রা। ঘটনার দিন সকাল ১১টার দিকে ৩০-৪০ জন লোক লাঠিসোটা নিয়ে বিদ্যুৎ অফিসে ঢুকে হামলা ও ভাংচুর করে । এমনকি ঘটনার বাঁধা দিতে গেলে এক পর্যায়ে আব্দুল লতিফ (৩৩) নামে এক লাইনম্যানের উপর হামলা চালানো হয়, এতে তিনি গুরুতর আহত হন। গত ২১ জুলাই নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় চুরির অভিযোগে দুই দিন আটকে রেখে নির্যাতনের পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় নয়ন হাওলাদার (৪২) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। নিহতের স্ত্রীর অভিযোগ, ৫০ হাজার টাকা চুরির অভিযোগে দুইদিন ধরে আটকে রেখে বিদ্যুতের তার এনে নয়নের শরীরে শক দেয় এবং বাম হাতের কব্জি ও আঙ্গুল গুলো মুচড়িয়ে ভেঙ্গে দেয়। গত ১৮ আগস্ট খুলনা মহানগরের বয়রা রায়েরমহল বড় মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে স্থানীয় লোকজনের গণপিটুনিতে রাজু বিশ্বাস নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়। গত ১৯ আগস্ট গাজীপুরের শ্রীপুরে প্রেমের ফাঁদে ফেলে আপত্তিকর ভিডিও ধারণ ও অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে এক নারীসহ চারজনকে আটক করে মারধর করার পর পুলিশে সোপর্দ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। গত ৫ জুলাই নারায়ণগঞ্জ শহরের পশ্চিম মাসদাইরে ছিনতাইকারী আখ্যা দিয়ে বিদ্যুতের খুঁটিতে বেঁধে জিসান (২৫) নামের এক তরুণকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওর তথ্যমতে, বিদ্যুতের খুঁটিতে রশি দিয়ে বাঁধা দুই তরুণকে স্টিলের পাইপ ও লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর করছেন স্থানীয় কয়েকজন। গত ১০ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারে গরু চুরির অভিযোগে তিনজনকে নির্যাতন করা হয়েছে। তাদের উপর নির্যাতনের পাশাপাশি তাদের শরীর উন্মুক্ত অবস্থায় তাদের নাক, মুখ ও চোখে চুন মাখানো হয়েছে এবং একজনের পা রক্তাক্ত হয়। গত ১৭ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের মহেশখালীর বড় মহেশখালী ইউনিয়নের পূর্ব ফকিরাঘোনা এলাকায় চোর সন্দেহে মো. ফয়সাল (২৬) নামের যুবককে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এমনকি ঘটনার কয়েকটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ভিডিওতে দেখা যায়, সড়কের পাশে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে যুবকের দুই হাত বাঁধা। তাঁর পিঠের ওপর তুলে দেওয়া হয়েছে ছয়–সাতটি ইট। ইটের ভারে কাত হয়ে আছেন তিনি। এর মধ্যেই চলছে পিটুনি। কেউ চুল টানছেন, কেউ মুখে ঘুষি মারছেন। নির্যাতনে তাঁর মুখে ফেনা চলে এলেও পিটুনি থামেনি। একপর্যায়ে মৃত্যু হয় তাঁর। গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাজধানীতে দুষ্কৃতকারী মব করে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও স্থাপনা ধ্বংস করে। এছাড়া, গত ২৯ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী বিক্রয়কে কেন্দ্র করে প্রকাশনা সংস্থা দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) রাজধানীর বাংলাবাজার বিক্রয়কেন্দ্রে শাটার টেনে তালা ঝুলিয়ে দেয় দুই যুবক। এসময় বিক্রয়কেন্দ্রের দুই বিক্রয়কর্মীকে আটক করে বই বিক্রি না করার শর্তে মুচলেখা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
সভা-সমাবেশে বাঁধা
গত তিন মাসে মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপের বেশ কিছু ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উক্ত সময়ে অন্তত ১৮ টি সভা ও সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা প্রদান করে, যার ফলে নির্ধারিত কর্মসূচি স্থগিত, ছত্রভঙ্গ অথবা বাতিল করতে বাধ্য হন আয়োজকরা। এই ধরনের হস্তক্ষেপের ফলে সংঘর্ষ ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং অন্তত ১২৮ জন ব্যক্তি আহত ও ৮ জন আটক হন, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ পথচারীও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
অজ্ঞাত লাশ
এই সময়ে সারাদেশ নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থানে দুর্বৃত্তদের হাতে হত্যাকাণ্ডের ২৮৫ টি ঘটনায় ৩০২ টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে বস্তাবন্দি অবস্থায় ২৯ টি, ঝুলন্ত অবস্থায় ৬৭ টি, শরীরে একাধিক আঘাতসহ ৪৩ টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গলা কেটে হত্যা ১৯ টি, হাত-পা বাঁধা ১৯ টি লাশ পাওয়া গেছে। এছাড়া এর বাইরে নানা ধরণের পরিস্থিতিতে আরও ১২৫ টি লাশ পাওয়া গেছে।
সংখ্যালঘু নির্যাতন
এটি উদ্বেগজনক যে, এই সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর কমপক্ষে ৬ টি হামলার ঘটনায় ৬ জন আহত হয়েছেন, এবং ২ টি মন্দির, ৫ টি প্রতিমা ও ৪ টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে ।
উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে গত ২৯ আগস্ট কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে হিন্দু পরিবারের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কয়েকজনের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, জমিতে ঘর নির্মাণে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি বিশম্ভর চন্দ্র বর্মনকে হত্যাচেষ্টা এবং তাঁর ছেলে ও পুত্রবধূকে মারধর ও শ্লীলতাহানির চেষ্টাও করা হয়। গত ২০ সেপ্টেম্বর সিলেটের বালাগঞ্জে দুর্গাপূজার পশ্চিম বাজার নবীনগর সার্বজনীন পূজামণ্ডপে ঢুকে বটি দিয়ে দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী ও কার্তিকের প্রতিমার বিভিন্ন অংশে কোপ দেন। এ ঘটনায় সাইদুজ্জামান শিমুল (২৯) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
সীমান্তে হত্যা ও নির্যাতন
গত তিন মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ১১ টি হামলার ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হামলায় নিহত ৪ জন, ও আহত হয়েছেন ৪ জন, যাদের সকলেই গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। ৬ জনকে বিভিন্ন সীমান্ত থেকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া, সীমান্তবর্তী এলাকায় একজন নারীর লাশ পাওয়া গেছে। এছাড়া, এই সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে তিন শতাধিক মানুষকে পুশইনের চেষ্টা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে এসব ব্যক্তিকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর প্রচেষ্টা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্মিলিত উদ্যোগে প্রতিহত করা হয়েছে ।
উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে গত ১০ জুলাই সিলেটের গোয়াইনঘাট সীমান্তে ভারতীয় স্থানীয় বাসিন্দা খাসিয়াদের গুলিতে মিনহাজ উদ্দিন (২৫) নামে এক বাংলাদেশি যুবক নিহত হয়েছেন। স্থানীয় সূত্রে, ঘটনার দিন দিবাগত রাত ৩টার দিকে মিনহাজ উদ্দিন উপজেলার সোনারহাট-লাখাট সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের লাখাট স্টেশনসংলগ্ন এলাকায় প্রবেশ করলে খাসিয়ারা তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে তিনি গুলিবিদ্ধ হন। গত ১৩ সেপ্টেম্বর ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় সীমান্তের ওপারে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে আহত আসাদুল হক বা আসাদুজ্জামান (৩৩) নামে এক বাংলাদেশি যুবক চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে। ঘটনার দিন দিবাগত রাত দেড়টার দিকে পীরগঞ্জের সীমান্ত থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার ভারতের ভেতরে প্রবেশ করলে বিএসএফের চকশিবানন্দ ক্যাম্পের সদস্যরা গুলি ছোড়েন। এতে আসাদুল হক আহত হন। এছাড়া একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ ও আহত মোস্তাকিম (৩৮) নামে আরও এক বাংলাদেশি যুবকের মৃত্যু হয়েছে। একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ শ্রী উদা চন্দ্র রায় (৩৫) নামে আরেক বাংলাদেশি যুবককে আটক করেছে বিএসএফ। গত ৯ আগস্ট মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সীমান্তের ওপারে ভারতের মাগুরুলি এলাকায় বিএসএফের গুলিতে তারা মিয়া (২০) এবং গত ৩০ আগস্ট পৃথক আরেকটি ঘটনায় হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার চিমটিবিল সীমান্তে সোহাগ মিয়া নামের এক বাংলাদেশি যুবক নিহত হন।
অপরদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ৪ টি সহিংসতার ঘটনায় ১ জন আহত, গুলিবিদ্ধ ১ জন এবং ৩ জনকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া স্থলমাইনে ২ জন নিহত ও ২ আহত হয়েছেন।
উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে গত ২৮ জুলাই বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার জারুলিয়াছড়ি সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে আরাকান আর্মি কর্তৃক পুতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে আবদুল করিম (২৫) নামের এক বাংলাদেশি যুবক গুরুতর আহত হয়েছেন। বিস্ফোরণে তাঁর বাঁ পায়ের হাঁটুর নিচের অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। গত ২৪ আগস্ট বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের মিয়ানমার অংশে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে মো. সাইফুল (২৫) নামে এক বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। বাঁশ কাটতে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে যাওয়ার পর পুঁতে রাখা ল্যান্ডমাইনের ওপর পা পড়লে বিস্ফোরণে তার দুই পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। গত ১৪ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের টেকনাফে নাফ নদীর মিয়ানমার অংশে মাছ ধরার সময় আরাকান আর্মির গুলিতে মো. ইদ্রিস (৫৫) নামে এক জেলে আহত হয়েছেন। স্থানীয়রা জানান, নাফ নদীতে মাছ ধরার সময় আরাকান আর্মির সদস্যরা জেলেদের ধাওয়া দেন। জেলেরা ফিরে আসার চেষ্টা করলে তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। এতে ইদ্রিসের পায়ে গুলি লাগে।
বিচার বহির্ভূত হত্যা (হেফাজতে/নির্যাতনে মৃত্যু)
দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, ভিকটিমের পরিবার ও এইচআরএসএস এর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে ও নির্যাতনের ঘটনায় অন্তত ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হেফাজতে ৫ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে ১ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া এ সময়ে আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর ভয়ে আটক এড়াতে পালাতে গিয়ে খালে পড়ে একজন, বহুভবন থেকে পড়ে দুইজন এবং পানিতে ডুবে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া পুলিশ কর্তৃক অটোরিক্সা জব্দ করায় মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে এক অটোরিক্সাচালকের মৃত্যু হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে গত ৯ জুলাই শোরগঞ্জের নিকলী থানা–হাজত থেকে রুবেল মিয়া (২১) নামের এক আসামির ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। গত ২০ জুলাই বগুড়া জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে থাকা আসাদুজ্জামান আসাদ (২৫) নামের এক আসামির মৃত্যু হয়েছে। জানা গত ২৯ জুন সারিয়াকান্দিতে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক আবদুল মান্নান মোল্লা (৪৫) হত্যা মামলার প্রধান আসামি হিসেবে আসাদকে গ্রেপ্তার করে জেলা ডিবি পুলিশ। তবে আটকের পরে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাজতখানার ওয়াশরুমে তার লাশ পাওয়া যায়। গত ৩০ জুলাই দুপুরের ফরিদগঞ্জে সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার মিজানুর রহমান (৫৫) নামে এক ব্যক্তি পুলিশ হেফাজতে মারা গেছেন।
গত ০৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ভূমি জরিপ অফিস সংলগ্ন বিটিসিএল তার ভান্ডার ভবনে চোর সন্দেহে আটক এক অজ্ঞাত যুবককে (বয়স আনুমানিক ২৫) পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। বিটিসিএলের অফিসকর্মী ও স্থানীয়দের বক্তব্য, ঘটনার দিন সকালে দেয়াল টপকে ভেতরে ঢোকার পর আনসার সদস্যরা ওই যুবককে আটক করে রশি দিয়ে পিলারের সঙ্গে বেঁধে মারধর করেন। এতে তিনি অচেতন হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে হাসপাতালে ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করে। গত ১০ সেপ্টেম্বর বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলায় পুলিশের হেফাজতে নাদিরা বেগম (৪০) নামে নারীর মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় ও পুলিশ সুত্র জানায়, ঘটনার দিন ভোররাতে ‘মাদকবিরোধী অভিযানের সময়’ নাদিরা বেগমকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার কাছ ইয়াবা পাওয়া যায়, এবং তা সে গিলে ফেলে। পরে আদালতে নেওয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করে। তবে নাদিরার স্বামী এনামুল হক গাজী দাবি, তার স্ত্রীকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। এছাড়া, গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৃথক ঘটনায় চুরি ও উত্ত্যক্তকরণের অভিযোগে পাঁচজনকে আটক করে আনসার সদস্যরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন। তবে হস্তান্তরের পর কক্ষে আটকে রাখা অবস্থায় অসুস্থ হয়ে জনি হোসেন (৩০) নামের এক তরুণের মৃত্যু হয়েছে।
জোরপূর্বক তুলে নেয়ার অভিযোগ
দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, ভিকটিমের পরিবার ও এইচআরএসএস এর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৬ আগস্ট রাজধানীর মিরপুর-১ এর ইউসিবি ব্যাংকের সামনে থেকে রাত ৮টা ২৩ মিনিটে ডিবি পুলিশ সাদা পোশাকে মোটরসাইকেল যোগে স্থানীয় ব্যবসায়ী শামীম খানকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আটকের দুইদিন পর ২৮ আগস্ট সন্ত্রাসবিরোধী আইনে অস্ত্রসহ আটক দেখানো হয়েছে। ভুক্তভোগীর স্ত্রী আরবী সুলতানা জানান, ঘটনার দিন ৩.০টার দিকে তার স্বামী বাসা থেকে বের হন। পরে রাতে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে পেরে দারুস সালাম থানা, মিরপুর থানা, শাহ আলী থানা ও ডিবি কার্যালয়ে খোঁজ নেন। কিন্ত সব জায়গা থেকে জানানো হয় শামীম খান নামে কেউ তাদের হেফাজতে নেই। তবে বর্তমানে ভুক্তভোগী শামীম খান জামিনে আছেন। ভুক্তভোগীর বক্তব্য অনুসারে, গত ২৬ আগস্ট রাজধানীর মিরপুর-১ থেকে তাকে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। সেখানো নানা বিষয়ে হুমকী-ধামকী দেওয়া হয়েছে এবং আটকের পর মিন্টো রোডের ডিবির কার্যালয়ে আটক ছিলেন। পরে তাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আটক দেখানো হয়েছে ।
কারা হেফাজতে মৃত্যু
এই সময়ে সারাদেশে কারাগারে কমপক্ষে ৩৭ জন আসামী মারা গিয়েছেন। ৩৭ জনের মধ্যে ১৪ জন কয়েদী ও ২৩ জন হাজতি। এর মধ্যে ৫ জন আওয়ামীলীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের এবং ৩২ জন সাধারণ কয়েদী।
চলতি বছরের ১৫ জুলাই থেকে ২৫ জুলাই ১০ দিনের ব্যবধানে সিরাজগঞ্জ জেলা কারাগারে তিন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জুলাই অসুস্থ হয়ে পড়ার পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের শাহজাদপুর ইউনিয়ন নেতা আমিনুল ইসলাম লিটন (৪৭), ২৩ জুলাই সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার রতনকান্দি ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক বাবলু মন্ডল (৫২), এবং ২৫ জুলাই ঢাকার প্রিজন হাসপাতালে কাওসার হোসেন (২২) নামে এক বন্দী চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। গত ৫ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৩.০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের আইসিইউতে পটুয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান খান মনির খান (৪৮) মারা যান।
গত ৬ সেপ্টেম্বর কেরানীগঞ্জ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অসুস্থ হয়ে ৪ বন্দির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সকাল ৭টা ২৪ মিনিট থেকে ৯টা ৫ মিনিটের মধ্যে ৩ জন কয়েদী চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়। তারা হলেন হাজতি আবুল বাশার (৫৪), কয়েদি আব্দুল কাইয়ুম (৬২) ও কয়েদি শাহাদাত হোসেন লিটন (৪৮)। এছাড়া রাত সোয়া ৯.০টার দিকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আজহারুল ইসলাম মিলনকে (৫১) অচেতন অবস্থায় ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে এলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এছাড়া, গত ২৭ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারে অসুস্থ হওয়ার পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় খাইরুল আমিন রুহুল সরকার (৫০) নামে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের এক নেতার মৃত্যু হয়েছে। তিনি কটিয়াদী উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন।
শ্রমিক নির্যাতন
গত তিন মাসে ২৫১ টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭১ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২৬০ জন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় অন্তত ১৬৪ জন শ্রমিক তাদের কর্মক্ষেত্রে মারা গেছেন। এছাড়া ১ জন গৃহপরিচালিকাকে হত্যা, ৩ জনের রহস্যজনক মৃত্যু ও ৩ জন গৃহপরিচালিকা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে দুই জন ছাড়া বাকি সবাই শিশু ও কিশোরী।
উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে গত ৩১ জুলাই নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের সাইলো গেট এলাকায় সাদ্দাম সরদার (৩৫) নামে এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, তাঁর ডান হাতের চামড়া উঠে যাওয়া, পেটে কালচে আঘাতের চিহ্ন এবং দুই পায়ে বেধড়ক পিটুনির ছাপ ও ঝলসে যাওয়ার ক্ষতচিহ্ন রয়েছে। গত ১২ আগস্ট সিলেট নগরীর রায়নগরের রাজবাড়ী মিতালী আবাসিক এলাকার গৃহকর্তা আব্দুস সত্তার মিয়া (৮২), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭২) ও গৃহপরিচারিকা তাহমিনা (১৫) কে একই বাসায় গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। গত ১৫ আগস্ট চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে জাহাজের ভেতরে মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইডের বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে ১০ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
গত ১৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কলাবাগানের গ্রীণরোডে তানিয়া (১১) নামে এক গ্রহকর্মীকে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা দিয়ে নির্যাতনের অভিযোগে গৃহকর্ত্রী মোর্শদা আক্তার ও তার স্বামী মো. সাইফুদ্দিন রাসেলকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, নিয়মিত নানা ভুলের কারণে শরীরের বিভিন্ন স্থানে গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দিতো গৃহকর্ত্রী মোর্শেদা। এমনকি বেদম প্রহার করা হতো। গত ২৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর বারিধারায় ডিপ্লোমেটিক জোনের ১ নম্বর সড়কের ফুটপাতে বসে বিশ্রামরত নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসানকে (২৪) গাড়িচাপা দেয় এক কিশোর। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। দায় এড়াতে নিহতের পরিবার ও অভিযুক্ত কিশোরের পরিবারের মধ্যে হত্যার পর ১০ লাখ টাকায় দুই পক্ষের মধ্যে আপসের চেষ্টা হয়। এছাড়া, গত ২৭ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের শ্রীপুরে দুই মাসের বকেয়া বেতনের দাবিতে ওসিন স্পিনিং লিমিটেডের শ্রমিকরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে। এসময় পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা শ্রমিকদের সরিয়ে দিতে লাঠিপেটা করলে অন্তত চারজন শ্রমিক আহত হন। এমনকি এসময়ে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে একাধিক সাউন্ডগ্রেনেড ছুড়ে পুলিশ।
নারী ও শিশু নির্যাতন
গত তিন মাসে কমপক্ষে ৭৮৩ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অন্তত ২৫৩ জন, যাদের মধ্যে ১৫৪ জন (৬১%) ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, ৪২ জন (১৭%) নারী ও কন্যা শিশু গণধর্ষনের শিকার হয়েছেন। ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়েছে ১২ জন ও ধর্ষিত হয়ে আত্মহত্যা করেছেন ১ জন, এদের মধ্যে ৫ জন শিশু ও কিশোরী । ২২০ জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন তন্মধ্যে শিশু ১০৩ (৪৭%) জন। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত ১৩, আহত হয়েছেন ১৭ জন নারী এবং ২ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ১৩৭ জন, আহত হয়েছেন ৬৮ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ৭২ জন নারী। এছাড়া এসিড সহিংসতায় আহত হয়েছেন ১ জন নারী।
অন্যদিকে, এটি উদ্বেগজনক যে, ৭৩৩ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যাদের মধ্যে ১৮৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৫৪৪ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে গত ৬ জুলাই মৌলভীবাজারে রাজনগর উপজেলায় রাজনগর উপজেলার মুন্সীবাজার ইউনিয়নের করিমপুর গ্রামে আলমগীর হোসেন নামে স্থানীয় এক বাসিন্দার বাড়ির উঠান খুঁড়ে নিজ স্ত্রী জাহেদা বেগমের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্ত্রীকে হত্যার পর মরদেহ মাটিচাপা দেওয়ার অভিযোগে আলমগীর হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত ২৪ জুলাই রাজধানীর মিরপুরের বড়বাগ এলাকায় যৌতুকের অর্থ না এনে দেওয়ায় স্বামী সোহেল কেরোসিন ঢেলে গৃহবধূ শিফা আক্তার (১৯) এর গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে ৫ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিংসাধীন অবস্থায় শেফার মৃত্যু হয়। শিফার বাবা জাহাঙ্গীর আলমের অভিযোগ, বিয়ের সময় ছয় ভরি সোনা ও নগদ দুই লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পাঁচ ভরি সোনা ও কিছু টাকা দেওয়া হলেও বাকি দাবিকৃত সোনা ও টাকা দিতে না পারায় সোহেল তাঁর মেয়ের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন। গত ২ আগস্ট নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলায় এক বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী তরুণীকে ধর্ষণ করে, পরে গ্রাম্য সালিশে বিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু বিয়ের ১৫ দিন পর তার শ্বশুর শাশুড়িসহ অন্যরা জোরপূর্বক ওষুধ খাইয়ে গর্ভের সন্তান নষ্ট করে দেন এবং তাকে তার বাবার বাড়িতে রেখে পাঠিয়ে দেয়।
গত ২ সেপ্টেম্বর চাঁদপুরের মতলব উত্তরের তিতারকান্দি গ্রামে ১৬ বছর বয়সী এক প্রতিবন্ধী কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ, ভয়ভীতি দেখিয়ে ধর্ষণের পর তাকে বিষয়টি গোপন রাখতে ১০০ টাকা দেওয়া হয়। পরে স্থানীয় সালিশে মীমাংসার চেষ্টা এবং ভুক্তভোগীর পরিবারকে ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। গত ১৯ সেপ্টেম্বর ভোলার দৌলতখান উপজেলায় যৌতুক না পেয়ে আখি আক্তার (১৯) নামে এক গৃবধুর শরীরে এসিড দিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে তার স্বামী হাসনাইন আহমেদ মুসার (২৫) বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, বিয়ের পাঁচ মাস পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের নির্যাতনের করে আসছিলো। এমনকি ঘটনার দিন রাতে স্বামী বাজার থেকে এসিড এনে তাঁর শরীরে লাগিয়ে দেন এবং পরে তাকে ঘরে আটকে রাখেন।
গত ২ আগস্ট ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার তারাকান্দি এলাকায় ৯ বছর বয়সী এক শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের দাবি, শিশুটিকে ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়েছে। গত ৬ আগস্ট অটো ছিনতাইয়ের ঘটনা দেখে ফেলায় রাজু আহম্মেদ নামে ১০ বছরের এক শিশুকে হত্যা করে জলাবদ্ধ ধানক্ষেতে পুতে রাখে দূর্বৃত্তরা। অনেক খোজাখুজির পরি শিশুটির অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। গত ১০ সেপ্টেম্বর পঞ্চগড়ের হাফিজাবাদ ইউনিয়নের রাজমহল-পূর্ববাগান এলাকায় প্রেমের সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে রাজমিস্ত্রি শ্রমিক সোহেল ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, সোহেল ওই ছাত্রীকে একটি বাড়িতে নিয়ে গিয়ে সহযোগীদের সহায়তায় ধর্ষণ করেন। পরে ওই স্কুলছাত্রী বিষপান করে আত্মহত্যা করেন। এছাড়া, গত ১৪ সেপ্টেম্বর জামালপুরের মাদারগঞ্জে সাত বছরের এক স্কুলছাত্রীকে স্কুল থেকে ডেকে নিয়ে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, জামিনুর নামে এক ব্যক্তি শিশুটিকে কৌশলে বাড়িতে নিয়ে ধর্ষণ করেন। পরে ওড়না দিয়ে পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করে মরদেহ ঘরের মেঝেতে খোঁড়া গর্তে পুঁতে রাখার অভিযোগ রয়েছে।
মামলা ও গ্রেফতার
এই সময়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীর নামে এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ধারায় কমপক্ষে ১২৬ টি মামলা হয়েছে। এ সকল মামলায় ২৫৪১ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৭৯১৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামী করা হয়েছে। এ সময়ে কমপক্ষে ২৫৭৭ আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যেখানে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মী অন্তত ২৪১২ জন, বিএনপির নেতাকর্মী ১১২ জন এবং জামায়াতের ৩৬ জন, এনসিপি ১৭ জন এবং ৩৭ জন চরমপন্থি। এছাড়া, সেপ্টেম্বর মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিশোরগ্যাং এর সাথে সম্পৃক্ততায় ও সন্দেহভাজন হিসেবে ৩১৪৫ জনের অধিক কিশোরকে আটক ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য জিম্মায় নেওয়া হয়েছে, যাদের মধ্যে আট শতাধিক কিশোরকে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পাশাপাশি, সন্ত্রাস, নাশকতা, পরোয়ানাভুক্ত আসামি গ্রেপ্তার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে নিয়মিত অভিযানও অব্যাহত ছিল। এসব অভিযানে ৩৭ সহস্রাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। রাজনৈতিক সহিংসতা, মব সহিংসতা ও গণপিটুনি, সাংবাদিক নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, নারী ও শিশু নির্যাতন, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, শ্রমিকদের নিরাপত্তাহীনতা এবং হেফাজতে ও কারাগারে মৃত্যুর মতো ঘটনাগুলো প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত, দায়ীদের আইনের আওতায় আনা, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে সরকার, রাজনৈতিক দল, বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে গঠনমূলক সংলাপ ও কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, শান্তিপূর্ণ ও মানবিক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যাতে সকল নাগরিকের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। এইচআরএসএস মনে করে, মানবাধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সহিংসতা প্রতিরোধ, ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা, নাগরিক স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা এবং প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত নিশ্চিত করাও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান বা মতাদর্শ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের জন্য আইনের সমান সুরক্ষা, ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার এবং মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। তাই হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) মানবাধিকার সুরক্ষা, আইনের সমান প্রয়োগ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি দায়িত্বশীল ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছে। একই সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া, ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়ানো এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় সকল নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনকে আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানাচ্ছে।
