Menu

News Details

Image

Quarterly Human Rights Report (January-March 2025)

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি জানুযারী-মার্চ ২০২৫

‘এইচআরএসএস’ এর ত্রৈমাসিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন ।

স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরেও বাংলাদেশে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, মানবাধিকার, ও গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। দেশের মানুষ এখনো স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল পায়নি। স্বাধীনতার পর গত ২০২৪ সালে মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল সবচেয়ে ভীতিকর ও চরম উদ্বেগজনক। গত আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচার শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশের মানুষের দায়িত্ব গ্রহন করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ছাত্র-জনতার মাঝে স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ আস্বাদনের আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হলেও তার প্রতিফলন মূলত ঘটেনি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং সংশ্লিষ্টরা এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সফলতা দেখাতে পারেনি। ২০২৫ সালের ১ম তিন মাসেও মানবাধিকার পরিস্থিতির প্রকৃত অবস্থা হতাশাজনক। নতুন বছরে মানবাধিকার পরিস্থিতির সার্বিক উন্নয়নের প্রত্যাশা থাকলেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের পূর্বের ধারা অব্যাহত থাকার পাশাপাশি এতে নতুন কিছু বিষয়ও যুক্ত হয়েছে।  পবিত্র মাহে রমজান মাসে বিগত বছরগুলোর তুলনায় দ্রব্যমূল্য ও ঈদযাত্রা কিছুটা স্বস্তিদায়ক হলেও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি হয়নি।

২০২৫ সালের ১ম তিন মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, রাজনৈতিক সহিংসতায় মৃত্যু, গণপিটুনিতে নির্যাতন ও হত্যা, নারী নিপীড়ণ ও ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, এবং  সাংবাদিকদের ওপর হামলা বৃদ্ধি পেয়েছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে ও নির্যাতনে মৃত্যু, শ্রমিকদের উপর হামলা, সংখ্যালঘু নির্যাতন, মাজারে হামলা ও ভাঙচুর, কারাগারে মৃত্যু, সভা-সমাবেশে বাধা প্রদান, আন্দোলনরত বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উপর পুলিশের হামলার মতো ঘটনা ঘটেছে। এসময়ে চাঁদাবাজি, চুরি, ছিনতাই,  ডাকাতি, ও হত্যাসহ বেশ কিছু সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে যা জনমনে ভয় ও আতঙ্ক তৈরি করেছে। সাবেক স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার বক্তব্য নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের ভার্চ্যুয়াল অনুষ্ঠানে প্রচারের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা ৫, ৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে অবস্থিত শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি, শেখ হাসিনার বাসভবন সুধা সদন এবং সারা দেশে বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের অফিস ও নেতাদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘর্ষ শিক্ষার্থীদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। রাজধানীতে বিভিন্ন দাবি আদায়ে রাস্তা বন্ধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। আদালতে রাজনৈতিক কর্মীদের উপর হামলা; থানা ও পুলিশের ওপর হামলা করে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টদের আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, যেখানে রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে । দেশে সন্ত্রাসবাদ দমন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনতে যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নামে বিশেষ অভিযানে কিছু অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া, ভারত সীমান্তে সংঘর্ষ, উত্তেজনা, বিএসএফের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে বেড়া নির্মাণ, উস্কানি, এমনকি নিরীহ বাংলাদেশিকে হত্যা, আহত ও গ্রেফতার এবং মিয়ানমারের আরাকান আর্মি কতৃক বাংলাদেশি জাহাজ আটক, সীমান্তে গুলি, মাইন ও মর্টারশেল বিস্ফোরণের মত বিভিন্ন ঘটনা মানবাধিকার পরিস্থিতির বিষয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এর সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ১ম তিন মাসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে নিন্মোক্ত তথ্য উঠে এসেছে:

Ø  জানুয়ারী-মার্চ এ তিন মাসে কমপক্ষে ৩২৫ টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৪৭ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২৪৭৫ জন। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক প্রতিশোধ পরায়ণতা, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন স্থাপনা দখল কেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সহিংসতার ৩২৫ টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ১৯০টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ১৬৭৩ জন ও নিহত ২৭ জন, ৫৮টি বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ২৭৩ জন ও নিহত ৮ জন, ১৬টি  বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৪৭ জন ও নিহত ২ জন, ৫টি বিএনপি-এনসিপির মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৪২ জন, , ৯টি আওয়ামী লীগ-এনসিপির মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৪৪ জন ও নিহত ১ জন, ৩টি আওয়ামী লীগ-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৫ জন, আওয়ামী লীগের অন্তর্কোন্দলে ৬টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৯১ জন ও নিহত ৫ জন, এনসিপির অন্তর্কোন্দলে ৯টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ২৯ জন এবং ২৯টি ঘটনা ঘটেছে বিভিন্ন দলের মধ্যে। নিহত ৪৭ জনের মধ্যে  বিএনপির ৩১ জন, আওয়ামী লীগের ১০ জন, জামায়াতের ১ জন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের ১ জন এবং ইউপিডিএফের ২ জন। অপর ২ জনের রাজনৈতিক পরিচয় মেলেনি যার মধ্যে ১ জন নারী রয়েছেন।  ৩২৫ টি সহিংসতার ঘটনার ২৬৯ টিই ঘটেছে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ও বিএনপির সাথে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে। গত ৩ মাসের রাজনৈতিক সহিংসতার তথ্যগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে জানুয়ারী ও ফেব্রুয়ারী মাসের তুলনায় মার্চ মাসে বিএনপির সাথে আওয়ামী লীগের সংঘর্ষ কমেছে এবং জামায়াত ও এনসিপির সাথে সংঘর্ষ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ৩৪টি ঘটনা ঘটেছে । এসকল হামলায় আওয়ামীলীগের ১২ জন, বিএনপির ১৩ জন, জামায়াতের ১ জন নারী সদস্য ও চরমপন্থী দলের ৪ জনসহ অন্তত ৩০ জন ব্যক্তি নিহত হয়েছে। এছাড়াও গত তিন মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৭০ জনের বেশি গুলিবিদ্ধ, চার শতাধিক বাড়ি-ঘর, রাজনৈতিক কার্যালয়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ও যানবাহনে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।

 

Ø  গত তিন মাসে অন্তত ৬৭ টি ঘটনায় কমপক্ষে ৯১ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সকল ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্ততপক্ষে ৫৮ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ৬ জন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ১১ জন ও গ্রেফতার হয়েছেন ৪ জন। এছাড়াও ১০ টি মামলায় ২৪ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা যে, মার্চ মাসে রাজধানীতে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক নারী সাংবাদিক । আদালত সুত্রে থেকে জানা গেছে, ওই নারী সাংবাদিক একটি পত্রিকায় সিনিয়র রিপোর্টার হিসাবে কর্মরত। এ সময়ে সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ এর অধীনে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ২ টি মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন ১ জন এবং অভিযুক্ত করা হয়েছে ৩ জনকে। এছাড়াও, গত তিন মাসে সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ এর অধীনে দায়ের করা অন্তত ৮ টি মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন ৬ জন এবং অভিযুক্ত করা হয়েছে ১৩ জনকে।

 

Ø  ২০২৫ সালের ১ম তিন মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ১৮ টি হামলার ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক গুলিবিদ্ধ হয়ে ৫ জন বাংলাদেশী নিহত, ১০ জন আহত, ও ১৫ জন গ্রেফতার হয়েছেন। সিলেট সীমান্তে ভারতীয় খা‌সিয়াদের গু‌লিতে শাহেদ আহমদ (২৫) নামে এক বাংলাদেশি তরুণ নিহত এবং অপর ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ২ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সীমান্তে এক বাংলাদেশী যুবককে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করেছে ভারতীয় নাগরিকরা। চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা সীমান্ত থেকে নাজিমুদ্দিন নামে এক যুবকের এবং কুমিল্লা সীমান্তে গোমতি নদীর পাড় থেকে কাজী ছবির নামে এক যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়। অপরদিকে বাংলাদেশ- মিয়ানমার সীমান্তে আরাকান আর্মির গুলিতে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে  গুলিবিদ্ধ হয়ে ২ আহত হয়েছেন। জানুয়ারী মাসে মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলি ও মর্টারশেল বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় এসে পড়ায় স্থানীয়দের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এছাড়াও মিয়ানমারের সীমান্ত ঘেষা বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরনে এক আনসার সদস্যসহ ৬ জন বাংলাদেশী আহত হয়েছেন।

 

Ø  এটি উদ্বেগজনক যে, এ সময়ে গণপিটুনীর অন্তত ৭০ টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৩১ জন এবং আহত হয়েছেন ৬৪ জন । বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় যে, গত ৪ মার্চ দুপুরে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ছিনতাইকারী সন্দেহে দুই ইরানি নাগরিককে গণপিটুনি দিয়ে আহত, গত ৩ মার্চ রাতে চট্টগ্রামের এওচিয়া ইউনিয়নে মাইকে ‘ডাকাত’ঘোষণা দিয়ে ২ জন জামাত কর্মীকে পিটিয়ে হত্যা, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে মাদারীপুরে ডাকাতির ঘটনায় শরিয়তপুরে ৭জন ডাকাতকে গনপিটুনির ঘটনায় ৫জন নিহত ও ২জন আহত হয়েছেন। হবিগঞ্জের বাহুবলে মোবাইল ফোনসেট চুরির সন্দেহে জাহেদ মিয়া (২৮) নামে  এক যুবককে গাছের সঙ্গে বেঁধে অমানুষিক নির্যাতন করার এক পর্যায়ে তাঁর গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে । পাবনার ঈশ্বরদীতে চুরির অভিযোগ এনে এক নারীকে লোহার খুঁটিতে বেঁধে মারধর করার পর জুতার মালা পরিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে।

 

Ø  দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, ভিকটিমের পরিবার ও এইচআরএসএস এর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-মার্চ মাসে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সংষর্ষে, হেফাজতে ও নির্যাতনে কমপক্ষে ৯ জন নিহত হয়েছেন। যাদের মধ্যে ৩ জন বন্দুকযুদ্ধের নামে, ৪ জন নির্যাতনে, ১ জন পুলিশ হেফাজতে এবং ১ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন। ০২ জানুয়ারি  সকালে রাঙামাটির লংগদু উপজেলার সদর ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের কাট্টলি বিল এলাকার কিচিংছড়ায় এ অজ্ঞাত ইউপিডিএফ সদস্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। ০৬ জানুয়ারি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে পুলিশের পিটুনিতে ইয়াসিন মিয়া নামে একজন সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক এর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে যৌথ বাহিনীর অভিযানে আটকের পর নির্যাতন ও চিকিৎসা না দেয়ায় সোনাপুর ইউনিয়নের ছাত্রদলের সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান (৩৪)  হাসপাতালে মারা গিয়েছেন। গত ২৫ জানুয়ারি শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার নাওডোবা এলাকায় পদ্মা সেতুর পাশে এসআই নওশের আলির পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) মাদকবিরোধী অভিযানের সময় মিলন ব্যাপারী (৫৫) নামের এক মুদির দোকান্দারকে নির্যাতন করে হত্যার অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। ৩১ জানুয়ারি গভীর রাতে বাড়ি থেকে যৌথবাহিনীর হাতে আটকের পর অমানবিক নির্যাতনের কারণে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার পাঁচথুবী ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক মো. তৌহিদুল ইসলাম (৪০) এর মৃত্যু ঘটেছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এলাকায় ২০ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে যৌথ বাহিনীর অভিযানের সময় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মিরাজ হোসেন ও মো. জুম্মন নামে দুই যুবক নিহত হয়েছেন। ২৪ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২ টার দিকে কক্সবাজারে অবস্থিত বিমান বাহিনী ঘাঁটি কক্সবাজার সংলগ্ন সমিতিপাড়ার স্থানীয়দের সাথে বিমান বাহিনীর সংষর্ষে শিহাব কবির নাহিদ (৩০) নামে একজন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। নিহত নাহিদের পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন, সংঘর্ষ চলাকালে বিমান বাহিনীর সদস্যদের গুলিতে নাহিদ মারা গেছেন। এই ঘটনায় বিমান বাহিনীর ৪ সদস্য আহত হয়েছেন। এছাড়া হেজাজ বিন আলম ওরফে এজাজ (৩৭) নামে এক ব্যক্তি পুলিশ হেফাজতে ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।

 

Ø  ২০২৫ সালের ১ম তিন মাসে সারাদেশে কারাগারে কমপক্ষে ২১ জন আসামী মারা গিয়েছেন । ২১ জনের মধ্যে ৯ জন কয়েদী ও ১২ জন হাজতি । এদের মধ্যে খুলনা ও নওগাঁ কারাগারে আক্তার শিকদার ও সিদ্দিক হোসেন নামে দুইজন আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে । এ সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর কমপক্ষে ৭ টি হামলার ঘটনায় ২ জন আহত, ১০ টি প্রতিমা ভাঙচুর, ও জমি দখলের মত ২ টি ঘটনা ঘটেছে।

 

Ø  গত তিন মাসে ৮৬ টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪৫ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২৯৪ জন। মার্চ মাসে বকেয়া বেতন পরিশোধ ও ঈদ বোনাসের দাবিতে বিক্ষোভরত বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষে অন্তত ৭৫ জন শ্রমিক আহত হয়েছেন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় ১৯ জন শ্রমিক তাদের কর্মক্ষেত্রে মারা গেছেন। ২ জন শিশু গৃহকর্মী মালিকের নির্যাতনে নিহত এবং ১ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।

 

Ø  গত তিন মাসে সাবেক স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের নামে কমপক্ষে ৫৫ টি মামলা হয়েছে। এ সকল মামলায় ৪১৭৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৮২৯১ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামী করা হয়েছে। গত তিন মাসে রাজনৈতিক মামলায় কমপক্ষে ১৪৩১২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যেখানে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মী অন্তত ১৪২৬৬ জন। এছাড়া পুলিশ গত তিন মাসে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন হিযবুত তাহ্‌রীর অন্তত ৪৫ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে । ৭ ফেব্রুয়ারি রাতে গাজীপুরে সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের বাড়িতে হামলার শিকার হন ১৫ থেকে ১৬ শিক্ষার্থী। এরপরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সমন্বয়ে অপারেশন ডেভিল হান্ট পরিচালনার করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। দেশব্যাপী যৌথবাহিনীর অপারেশন ডেভিল হান্টে ৭ ফেব্রুয়ারি রাতে গাজীপুরে সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের বাড়িতে হামলার শিকার হন ১৫ থেকে ১৬ শিক্ষার্থী। এরপরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সমন্বয়ে অপারেশন ডেভিল হান্ট পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। দেশব্যাপী যৌথবাহিনীর অপারেশন ডেভিল হান্টে মোট গ্রেফতার হয়েছেন ১২৫০০ জনের বেশি। এছাড়া অপারেশন ডেভিল হান্টের পাশাপাশি বিভিন্ন নতুন ও পুরাতন মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে ২০ হাজারের অধিক ব্যক্তিকে । গ্রেফতারকৃতদের অধিকাংশই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দলীয় নেতা-কর্মী ।

Ø  গত তিন মাসে কমপক্ষে ৫১২ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন কমপক্ষে ২৪০ জন, যাদের মধ্যে ১৪৬ (৬০%) জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, ৫৭ (২৩%) জন নারী ও কন্যা শিশু গণধর্ষনের শিকার হয়েছেন এবং ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়েছে ৩ জনকে ও আত্মহত্যা করেছেন ৬ জন নারী । ১৩৭ জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন তন্মধ্যে শিশু ৮১ জন। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা যে, গত মার্চ মাসে মাগুরায় আছিয়া নামে  ৮ বছরের এক শিশুকে তার বোনের শশুর ধর্ষণের পর হত্যা চেষ্টা করে এবং শিশুটি ৮ দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় (১৩ মার্চ) ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মারা যায়। এছাড়াও মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে ফাতেমা নামের একটি শিশুকে (৬) ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে শ্বাসরোধে হত্যার পর মরদেহ দীঘিতে ফেলে দেয়। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১২ জন ও আহত হয়েছেন ৪ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ১ জন নারী । পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৭৮ জন, আহত হয়েছেন ৮ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ৩১ জন নারী। অন্যদিকে,  গত তিন মাসে কমপক্ষে ৩৯৯ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যাদের মধ্যে ৮৩ জন প্রান হারিয়েছেন এবং ৩১৬ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

 

দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নে রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, সাংবাদিক, ও নাগরিকদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সার্বিক পরিস্থিতি উন্নয়ন করা জরুরি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আর এ সকল বিষয় বাস্তবায়ন করতে না পারলে দেশের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি  অবনতির দিকে যাবে। তাই “এইচআরএসএস”র পক্ষ থেকে সরকারকে মানবাধিকার রক্ষায় ও সার্বিক পরিস্থিতি উন্নয়নে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে এবং দেশের সকল সচেতন নাগরিক, সাংবাদিক, সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও দেশি- বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে আরো সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।