News Details
Human Rights Situation Report of Bangladesh (September 2026)
মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন
বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি (সেপ্টেম্বর-২০২৬)
সেপ্টেম্বর ২০২৬ মাসে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি রাজনৈতিক, সামাজিক, আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা সংক্রান্ত বিভিন্ন ঘটনায় বহুমাত্রিকভাবে আলোচিত হয়েছে। এ সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, দলীয় অন্তর্কোন্দল, ব্যাপক রাজনৈতিক গ্রেপ্তার, সভা-সমাবেশে বাধা, জোড়পূর্বক অপহরন, এবং বাকস্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপের অভিযোগ বিশেষভাবে দৃশ্যমান ছিল। একই সঙ্গে জমি দখল, চাঁদাবাজি ও স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে হামলা, ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। রাজধানীতে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও স্থাপনা ধ্বংস এবং কনটেন্ট নির্মাতা সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা জননিরাপত্তা ও সম্পত্তির সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। একইভাবে আশুলিয়ার শ্রীপুরে মাদ্রাসা ট্রাস্টের নিয়ন্ত্রণ ও মার্কেট দখলকে কেন্দ্র করে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও স্থানীয় আধিপত্যের সহিংস রূপকে সামনে এনেছে।
জননিরাপত্তার ক্ষেত্রে মব সহিংসতা, কিশোরগ্যাংয়ের আধিপত্য, দুর্বৃত্তের হামলায় নিহত এবং বিভিন্ন স্থান থেকে অজ্ঞাত লাশ উদ্ধারের ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এসব ঘটনা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিয়ে শঙ্কা তৈরি করেছে। একই সময়ে হেফাজতে মৃত্যু, কারাগারে মৃত্যু, সীমান্তে হতাহত, শ্রম অধিকার লঙ্ঘন এবং নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনাও অব্যাহত ছিল। এসব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা, চিকিৎসা, আইনি সহায়তা এবং কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
রাজনৈতিক পরিসরে বিভিন্ন দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ, আন্তঃদলীয় সংঘর্ষ, স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে সংঘাত ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন স্থানে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি, সভা-সমাবেশ ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। পাশাপাশি ব্যাপক রাজনৈতিক গ্রেপ্তার ও মামলা দায়েরের ঘটনা নাগরিক স্বাধীনতা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
মতপ্রকাশ ও বাকস্বাধীনতার ক্ষেত্রেও সেপ্টেম্বর মাসে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি পরিলক্ষিত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত প্রকাশ, রাষ্ট্র ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সমালোচনা কিংবা ভিন্নমত প্রকাশকে কেন্দ্র করে চাপ, মামলা ও হয়রানির অভিযোগ এসেছে। একই সময়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি, লাঞ্ছনা ও হয়রানির ঘটনাও সাংবাদিকদের নিরাপদ ও স্বাধীনভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পরিবেশকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। এ ধরনের পরিস্থিতি নাগরিকদের স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ এবং জনগণের তথ্য জানার অধিকারের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যৌথবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান, গ্রেপ্তার ও মামলা দায়ের অব্যাহত থাকলেও এসব কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা, আনুপাতিকতা এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে আটক ব্যক্তিদের অধিকার, আদালতের তত্ত্বাবধান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারাগারে মৃত্যুর ক্ষেত্রেও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বন্দিদের যথাযথ চিকিৎসা ও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
সামগ্রিকভাবে, সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর ঘটনাপ্রবাহ আইনের শাসন, নাগরিক স্বাধীনতা, জননিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিতামূলক শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিভিন্ন চ্যালেঞ্জকে সামনে এনেছে। রাজনৈতিক সহিংসতা, ব্যাপক গ্রেপ্তার, সভা-সমাবেশে বাধা, বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, হেফাজতে মৃত্যু, জোড়পূর্বক অপহরন, জমিদখল ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, মব ও কিশোরগ্যাং সহিংসতা এবং কারাগারে মৃত্যুর মতো ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের কার্যকর প্রতিকার, দোষীদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রমেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও সংগঠনের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ১৬ টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এর সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে নিন্মোক্ত তথ্য উঠে এসেছে:
রাজনৈতিক সহিংসতা
সেপ্টেম্বর মাসে কমপক্ষে ৬৮ টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৪ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৫২৭ জন। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ ও হামলা, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন, দলীয় ও অন্তকোন্দল, দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। আগস্ট মাসের তুলনায় সেপ্টেম্বর মাসে রাজনৈতিক সহিংসতা ও হতাহতের সংখ্যা কিছুটা কমেছে। গত আগস্ট মাসে ৭০ টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় নিহত হয়েছেন ০৭ জন এবং আহত হয়েছেন ৫৩৬ জন।
সেপ্টেম্বর মাসে সহিংসতার অন্তত ৬৮ টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ৩৫ টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৩৪০ জন ও নিহত ০১ জন। ০৭ টি বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৬১ জন, ০৬ টি বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে আহত ৪২ জন ও নিহত ০১ জন । ০২ টি জামায়াত-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে আহত ৩ জন ও নিহত ০১ জন, ০৩ টি বিএনপি-এনসিপি মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৬ জন, ০৭ টি বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষে ১৫ জন আহত হয়েছেন। বিভিন্ন দলের মধ্যে ০৭ টি ঘটনায় আহত হয়েছে ৫০ জন ও নিহত ০১ জন । নিহত ০৪ জনের মধ্যে বিএনপির ০১ জন, জামায়াতের ১ জন ও আওয়ামী লীগের ০২ জন।
|
ক্রম |
রাজনৈতিক দলসমূহ |
ঘটনা |
আহত |
নিহত |
|
১ |
বিএনপি- বিএনপি |
৩৫ |
৩৪০ |
০১ |
|
২ |
বিএনপি-জামায়াত |
০৭ |
৬১ |
|
|
|
জামায়াত-আওয়ামী লীগ |
০২ |
০৩ |
০১ |
|
৩ |
আওয়ামী লীগ-আওয়ামী লীগ |
০১ |
|
০১ |
|
৪ |
বিএনপি-আওয়ামী লীগ |
০৬ |
৪২ |
০১ |
|
৫ |
বিএনপি-এনসিপি |
০৩ |
১৬ |
|
|
৬ |
বিএনপি-অন্যান্য দল |
০৭ |
১৫ |
|
|
৭ |
অন্যান্য দলের মধ্যে |
০৭ |
৫০ |
|
|
মোট |
৬৮ |
৫২৭ |
০৪ |
|
এর পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ১২ টি ঘটনায় ০৫ জন আহত এবং ৭ জন নিহত হযেছেন। নিহতদের মধ্যে বিএনপি ০৫ জন, জামায়াতের ১ জন ও চরমপন্থী ০১ জন। এছাড়া অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। সারাদেশে আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রীক ২৩ টি ঘটনায় অন্তত ৬৩ টি বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়াও, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থী ও তাঁদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সহিংসতা ও হামলার ঘটনা ঘটেছে। সেপ্টেম্বর মাসে আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ২টি ঘটনায় অন্তত ২০ জন আহত হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে গত ১৮ সেপ্টেম্বর নেত্রোকোনার খালিয়াজুরিতে পুরোনো বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিএনপি উপজেলার চাকুয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আব্দুর রহমান ও ইউনিয়ন শ্রমিক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লিগেল মিয়ার অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ২৮ জন আহত হন। এর মধ্যে শাহ আলমগীর (২২) নামে এক যুবক গুরুতর আহত হলে ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আলমগীরের মৃত্যু হয়। গত ১০ সেপ্টেম্বর ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার ভায়না ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড সভাপতি মোনায়েম হোসেনকে (৪৮) কুপিয়ে হত্যা করে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা।
সভা-সমাবেশে বাঁধা
এ মাসে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপের একাধিক ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উক্ত সময়ে অন্তত ০৬ টি সভা ও সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা প্রদান করে, যার ফলে নির্ধারিত কর্মসূচি স্থগিত, ছত্রভঙ্গ অথবা বাতিল করতে বাধ্য হন আয়োজকরা। এই ধরনের হস্তক্ষেপের ফলে সংঘর্ষ ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং অন্তত ৪৭ জন আহত হয়েছে, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ পথচারীও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
গত আগস্ট মাসে ১৩ টি সভা ও সমাবেশ বাধা প্রদানের ঘটনায় ৬১ জন আহত ও ৮জনকে আটক করা হয়।
সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানী
এটি উদ্বেগজনক যে, এ মাসে অন্তত ২০ টি নির্যাতনের ঘটনায় কমপক্ষে ৩৫ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সকল ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্ততপক্ষে ১৬ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ১২ জন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ০৩ জন সাংবাদিক। ১ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। এছাড়া সংবাদ প্রকাশের জেরে মানহানির ইস্যুতে ৪ টি মামলায় ৩ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে, এর মধ্যে সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ এর আওয়ায় ০১ টি মামলা হয়েছে।
গত আগস্ট মাসে ৩২ টি নির্যাতনের ঘটনায় ৪৫ জনের অধিক সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হন, এর মধ্যে আহত হয় অন্ততপক্ষে ২৬ জন।
উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে গত ২০ সেপ্টেম্বর যশোরের কেশবপুর প্রেসক্লাবে হামলা চালিয়ে ‘মব’ সৃষ্টি করে ক্লাব দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এসময়ে প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক লোক সমাজ-এর কেশবপুর প্রতিনিধি জয়দেব চক্রবর্তী, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক কল্যাণ-এর কেশবপুর প্রতিনিধি আবদুল্লাহ আল ফুয়াদ এবং নির্বাহী সদস্য ও দৈনিক সময়ের খবর-এর কেশবপুর প্রতিনিধি মেহেদী হাসান জাহিদসহ কয়েকজন সাংবাদিক আহত হয়েছেন। এছাড়া গত ১৯ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে সড়ক নির্মাণে অনিয়মের তথ্য সংগ্রহের সময়ে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বাংলা টিভির কুমারখালী-খোকসা প্রতিনিধি মাহবুবুল আহসান উল্লাসের ওপর হামলা হয়, এতে তিনি গুরুতর আহত হন।
মত প্রকাশের স্বাধীনতা
এ মাসে মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এমাসে অন্তত ১২ টি ঘটনায় ১৪ জনকে আটক ও ১২ টি মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় অন্তত ২৬ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ও রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে সমালোচনায় ০৬ জন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও কটুক্তির অভিযোগে ০২ জন এবং অন্যান্য ইস্যুতে ০৬ জনকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া এ মাসে জুলাই ইস্যু, মাদক, বিদ্যুৎ বিভ্রাটসহ নানা বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৩ জনকে কুপিয়ে, পিটিয়ে বা আগুনে পুড়িয়ে হত্যা, ১ জন নির্যাতন, ৬ জনকে চাকরিচ্যুত বা অব্যহতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জাতীসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণকে সমালোচনায় ১জন শিক্ষককে আটক করা হলেও পরে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তেক্ষেপে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ -এর বিভিন্ন ধারার অধীনে পৃথক ০৩ টি মামলায় ১০ জনকে ও ০৩ জনকে আটকও করা হয়েছে।
গত আগস্ট মাসে ৮ টি ঘটনায় ১০ জনকে আটক ও ৮ টি মামলা দায়ের হয়। এসব মামলায় অন্তত ১১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।
মব সহিংসতা ও গণপিটুনী
এ মাসে সারাদেশ চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাক-বিতন্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননা, ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টাসহ নানা অভিযোগে গণপিটুনী ও মব সহিংসতার ৩৫ টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৯ জন এবং আহত হয়েছেন ৩২ জন।
গত আগস্ট মাসে ৫৩ টি ঘটনায় নিহত হন অন্তত ২৮ জন এবং আহত হন ৬২ জন।
উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে গত ১০ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারে গরু চুরির অভিযোগে মধ্যযুগীয় কায়দায় তিনজনকে নির্যাতন করা হয়েছে। নির্যাতনের শিকার যুবকরা হলেন, উপজেলার বাংলাবাজার ইউনিয়নের বড়ইউড়ি গ্রামের হাসান আলীর ছেলে আবু বক্কর (৩৫) ও পূর্ব গিলাতলী গ্রামের মৃত মফিজ আলীর ছেলে নিজাম উদ্দিন (৩০) এবং পার্শ্ববর্তী ছাতক উপজেলার নোয়ারাই ইউনিয়নের জোড়াপানি গ্রামের মৃত শেরগুল মিয়ার ছেলে সোনাই মিয়া (২৫)। জানা যায়, বুধবার রাতে উপজেলার বাংলাবাজার ইউনিয়নের বক্তারপুর গ্রামের ইকবাল হোসেনের দুটি গরু চুরি হয়। এসময় অভিযুক্ত সোনাই মিয়াকে আটক করা হলে তার তথ্যমতে আবু বক্কর ও নিজাম উদ্দিনকেওে আটক করে এলাকাবাসী। পরে তাদের উপর নির্যাতনের পাশাপাশি তাদের শরীর উন্মুক্ত অবস্থায় তাদের নাক, মুখ ও চোখে চুন মাখানো হয়েছে এবং একজনের পা রক্তাক্ত হয়। গত ১৭ সেপ্টেম্বর ক্সবাজারের মহেশখালীর বড় মহেশখালী ইউনিয়নের পূর্ব ফকিরাঘোনা এলাকায় চোর সন্দেহে মো. ফয়সাল (২৬) নামের যুবককে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এমনকি ঘটনার কয়েকটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ভিডিওতে দেখা যায়, সড়কের পাশে বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে যুবকের দুই হাত বাঁধা। তাঁর পিঠের ওপর তুলে দেওয়া হয়েছে ছয়–সাতটি ইট। ইটের ভারে কাত হয়ে আছেন তিনি। এর মধ্যেই চলছে পিটুনি। কেউ চুল টানছেন, কেউ মুখে ঘুষি মারছেন। নির্যাতনে তাঁর মুখে ফেনা চলে এলেও পিটুনি থামেনি। একপর্যায়ে মৃত্যু হয় তাঁর। আর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এ দৃশ্য দেখছিলেন ১৫ থেকে ২০ জন মানুষ। গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাজধানীতে দুষ্কৃতকারী মব করে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও স্থাপনা ধ্বংস করে।
সংখ্যালঘু নির্যাতন
এটি উদ্বেগজনক যে, এই সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর কমপক্ষে ০৩ টি হামলার ঘটনায় ৫ জন আহত হয়েছে। এর পাশাপাশি এসব ঘটনায় ২ টি মন্দির, ৫ টি প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে ।
গত ২০ সিপ্টেম্বর সিলেটের বালাগঞ্জে দুর্গাপূজার পশ্চিম বাজার নবীনগর সার্বজনীন পূজামণ্ডপে ঢুকে বটি দিয়ে দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী ও কার্তিকের প্রতিমার বিভিন্ন অংশে কোপ দেন। এ ঘটনায় সাইদুজ্জামান শিমুল (২৯) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
অজ্ঞাত লাশ
সেপ্টেম্বর মাসে সারাদেশ নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থানে দুর্বৃত্তদের হাতে হত্যাকাণ্ডের শিকার ৬৬ টি ঘটনায় ৬৯ টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। এর মধ্যে বস্তাবন্দি অবস্থায় ১১ টি, ঝুলন্ত অবস্থায় ২৪ টি, শরীরে একাধিক আঘাতসহ ৮ টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া গলা কেটে হত্যা ৬ টি, হাত-পা বাঁধা ৯ টি লাশ পাওয়া গেছে। এছাড়া এর বাইরে নানা ধরণের পরিস্থিতিতে আরও ১১ টি লাশ পাওয়া গেছে।
গত আগস্ট মাসে সারাদেশ নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থানে দুর্বৃত্তদের হাতে হত্যাকাণ্ডের শিকার ৮২ টি ঘটনায় ৮৭ টি লাশ উদ্ধার হয়।
সীমান্তে হত্যা ও নির্যাতন
সেপ্টেম্বর মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ০৩ টি ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হামলায় নিহত হয়েছেন ২ জন এবং আহত হয়েছেন ৩ জন, যাদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে হয়েছন ৫ জন। এছাড়া ১ জনকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে একজনের লাশ পাওয়া গেছে। এছাড়া বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে শতাধিক পুশইনের চেষ্টা করা হয়েছে। গত আগস্ট মাসে ৮টি ঘটনায় ২ জন নিহত, ১ জন আহত ও ৫ জনকে আটক করা হয়।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় সীমান্তের ওপারে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে আহত নিহত আসাদুল হক বা আসাদুজ্জামান (৩৩) নামে এক বাংলাদেশি যুবক চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে। ঘটনার দিন দিবাগত রাত দেড়টার দিকে পীরগঞ্জের সীমান্ত থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার ভারতের ভেতরে প্রবেশ করলে বিএসএফের চকশিবানন্দ ক্যাম্পের সদস্যরা গুলি ছোড়েন। এতে আসাদুল হক আহত হন। পরে বিএসএফ সদস্যরা তাঁকে ভারতের রায়গঞ্জের একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এছাড়া একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ ও আহত মোস্তাকিম (৩৮) নামে আরও এক বাংলাদেশি যুবকের মৃত্যু হয়েছে। একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ শ্রী উদা চন্দ্র রায় (৩৫) নামে আরেক বাংলাদেশি যুবককে আটক করেছে বিএসএফ।
অপরদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে আরাকান আর্মির গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে একজন আহত হয়েছে। গত আগস্ট মাসে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে পুতে রাখা স্থলমাইন বিষ্ফোরনে একজন বাংলাদেশী যুবক নিহত, ১ জন আহত ও ৩ জনকে জলসীমা থেকে আটক হয়েছে।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের টেকনাফে নাফ নদীর মিয়ানমার অংশে মাছ ধরার সময় আরাকান আর্মির গুলিতে মো. ইদ্রিস (৫৫) নামে এক জেলে আহত হয়েছেন। স্থানীয়রা জানান, নাফ নদীতে মাছ ধরার সময় আরাকান আর্মির সদস্যরা জেলেদের ধাওয়া দেন। জেলেরা ফিরে আসার চেষ্টা করলে তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। এতে ইদ্রিসের পায়ে গুলি লাগে।
বিচার বহির্ভূত হত্যা (হেফাজতে/নির্যাতনে/গুলি/বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যু)
দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, ভুক্তভোগীর পরিবার ও এইচআরএসএসের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে হেফাজতে ও নির্যাতনে কমপক্ষে ০৩ জন নিহত হয়েছে। এরমধ্যে ০১ জন নির্যাতনে ও ০২ জন আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর হেফাজতে মারা গেছে। এছাড়া আটক এড়াতে পুলিশ দেখে দৌড়ে পালানোর সময় ড্রেনে পড়ে আহত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে।
গত ০৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ভূমি জরিপ অফিস সংলগ্ন বিটিসিএল তার ভান্ডার ভবনে চোর সন্দেহে আটক এক অজ্ঞাত যুবকে (বয়স আনুমানিক ২৫) পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। বিটিসিএলের অফিসকর্মী ও স্থানীয়দের বক্তব্য, ঘটনার দিন সকালে দেয়াল টপকে ভেতরে ঢোকার পর আনসার সদস্যরা ওই যুবককে আটক করে রশি দিয়ে পিলারের সঙ্গে বেঁধে মারধর করেন। এতে তিনি অচেতন হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে হাসপাতালে ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করে।
গত ১০ সেপ্টেম্বর বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলায় পুলিশের হেফাজতে নাদিরা বেগম (৪০) নামে নারীর মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় ও পুলিশ সুত্র জানায়, ঘটনার দিন ভোররাতে ‘মাদকবিরোধী অভিযানের সময়’ নাদিরা বেগমকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার কাছ ইয়াবা পাওয়া যায়, এবং তা সে গিলে ফেলে। পরে আদালতে নেওয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করে। তবে নাদিরার স্বামী এনামুল হক গাজী দাবি, তার স্ত্রীকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৃথক ঘটনায় চুরি ও উত্ত্যক্তকরণের অভিযোগে পাঁচজনকে আটক করে আনসার সদস্যরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন। তবে হস্তান্তরের পর কক্ষে আটকে রাখা অবস্থায় অসুস্থ হয়ে জনি হোসেন (৩০) নামের এক তরুণের মৃত্যু হয়েছে।
জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার অভিযোগ
দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, ভিকটিমের পরিবার ও এইচআরএসএস এর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৬ আগস্ট রাজধানীর মিরপুর-১ এর ইউসিবি ব্যাংকের সামনে থেকে রাত ৮টা ২৩ মিনিটে ডিবি পুলিশ সাদা পোশাকে মোটরসাইকেল যোগে স্থানীয় ব্যবসায়ী শামীম খানকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আটকের দুইদিন পর ২৮ আগস্ট সন্ত্রাসবিরোধী আইনে অস্ত্রসহ আটক দেখানো হয়েছে। ভুক্তভোগীর স্ত্রী আরবী সুলতানা জানান, ঘটনার দিন ৩টার দিকে বাসা থেকে বাসা থেকে বের হন। পরে রাতে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে পেরে দারুস সালাম থানা, মিরপুর থানা, শাহ আলী থানা ও ডিবি কার্যালয়ে খোজ নেয়। কিন্ত সব জায়গা থেকে জানানো হয় শামীম খান নামে কেউ তাদের হেফাজতে নেই। তবে বর্তমানে ভুক্তভোগী শামীম খান জামিনে আছেন। ভুক্তভোগীর বক্তব্য অনুসারে, গত ২৬ আগস্ট রাজধানীর মিরপুর-১ থেকে তাকে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। সেখানো নানা বিষয়ে হুমকী-ধামকী দেওয়া হয়েছে এবং আটকের পর মিন্টো রোডের ডিবির কার্যালয়ে আটক ছিলেন। পরে তাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আটক দেখানো হয়েছে ।
কারা হেফাজতে মৃত্যু
এ মাসে সারাদেশে কারাগারে কমপক্ষে ২১ জন আসামী মারা গিয়েছেন। এর মধ্যে ১১ জন জন কয়েদী ও ১০ জন হাজতী। মৃত ২১ জনের মধ্যে ০২ জন আওয়ামীলীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের এবং বাকী ১৯ জন সাধারণ কয়েদী। কয়েদী। গত আগস্ট মাসে কারাগারে ১ জন কয়েদী ও ৫ জন হাজতীসহ ৬ জন আসামী মারা যায় ।
গত ৬ সেপ্টেম্বর কেরানীগঞ্জ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অসুস্থ হয়ে ৪ বন্দির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সকাল ৭টা ২৪ মিনিট থেকে ৯টা ৫ মিনিটের মধ্যে ৩ জন কয়েদী চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়। তারা হলেন হাজতি আবুল বাশার (৫৪), কয়েদি আব্দুল কাইয়ুম (৬২) ও কয়েদি শাহাদাত হোসেন লিটন (৪৮)। এছাড়া রাত সোয়া ৯টার দিকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আজহারুল ইসলাম মিলনকে (৫১) অচেতন অবস্থায় ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে এলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। গত ২৭ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারে অসুস্থ হওয়ার পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় খাইরুল আমিন রুহুল সরকার (৫০) নামে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের এক নেতার মৃত্যু হয়েছে। তিনি কটিয়াদী উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন।
শ্রমিক নির্যাতন
সেপ্টেম্বর মাসে অন্তত ৮৮ টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৯ জন, আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১২১ জন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় অন্তত ৪৬ জন শ্রমিক তাদের কর্মক্ষেত্রে মারা গেছেন। এছাড়া পৃথক দুইটি ঘটনায় ০২ জন গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়ছেন। গত আগস্ট মাসে ৮৪ টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় ১৯ জন নিহত ও ৬৭ জন আহত হয়। এছাড়া ৬৩ জন শ্রমিকের কর্মস্থলে এবং ২জন গৃহকর্মী তার কর্তার বাড়িতে মারা যান।
উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে গত ১৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কলাবাগানের গ্রীণরোডে তানিয়া (১১) নামে এক গ্রহকর্মীকে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা দিয়ে নির্যাতনের অভিযোগে গৃহকর্ত্রী মোর্শদা আক্তার ও তার স্বামী মো. সাইফুদ্দিন রাসেলকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, নিয়মিত নানা ভুলের কারণে শরীরের বিভিন্ন স্থানে গরম খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকা দিতো গৃহকর্ত্রী মোর্শেদা। এমনকি বেদম প্রহার করা হতো। তাছাড়া ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না। কখনো কখনো শাস্তিস্বরূপ টয়লেটে আটকে রাখা হতো। গত ২৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর বারিধারায় ডিপ্লোমেটিক জোনের ১ নম্বর সড়কের ফুটপাতে বসে বিশ্রামরত নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসানকে (২৪) গাড়িচাপা দেয় এক কিশোর। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। দায় এড়াতে নিহতের পরিবার ও অভিযুক্ত কিশোরের পরিবারের মধ্যে হত্যার পর ১০ লাখ টাকায় দুই পক্ষের মধ্যে আপসের চেষ্টা হয়। এছাড়া গত ২৭ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের শ্রীপুরে দুই মাসের বকেয়া বেতনের দাবিতে ওসিন স্পিনিং লিমিটেডের শ্রমিকরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে। এসময় পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা শ্রমিকদের সরিয়ে দিতে লাঠিপেটা করলে অন্তত চারজন শ্রমিক আহত হন। এমনকি এসময়ে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে একাধিক সাউন্ডগ্রেনেড ছুড়ে পুলিশ।
নারী ও শিশু নির্যাতন
সেপ্টেম্বর মাসে কমপক্ষে ২৩৬ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অন্তত ৭৯ জন, যাদের মধ্যে ৪৭ (৬০%) জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, ১৩ জন নারী ও কন্যা শিশু গণধর্ষনের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের পর ৫ জন নারী ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ৩ জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। এছাড়া ধর্ষণণের পর এক নারী আত্মহত্যা করেছেন। অন্যদিকে ৪৯ জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন তন্মধ্যে শিশু ২৫ জন। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত ০৬ জন, আহত হয়েছেন ০৪ জন নারী এবং আত্মহত্যা করেছেন একজন নারী। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৪৩ জন, আহত হয়েছেন ২৭ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ২৬ জন নারী। এছাড়া একজন নারী দাহ্য পদার্থ এসিড নিক্ষেপের মাধ্যম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
গত আগস্ট মাসে ২৮৯ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হন। এর মধ্যে ধর্ষণে ৭৯ জন, গণ ধর্ষণে ১৮জন, ধর্ষণ চেষ্টা ও যৌন হয়রানিতে ৯৩ জন, পারিবারিক সহিংসতায় ১০৩, যৌতুকের দাবিতে ১৪ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হন।
অন্যদিকে, এটি উদ্বেগজনক যে, ২৭১ জন শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছেন যাদের মধ্যে ৭৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১৯৩ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এ মাসে অন্তত ৭জন শিশু বলাৎকারের শিকার হয়েছেন।
গত আগস্টে ৭৭ জন প্রাণ হারানোর পাশাপাশি ২৮২ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন।
উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে গত ২ সেপ্টেম্বর চাঁদপুরের মতলব উত্তরের তিতারকান্দি গ্রামে ১৬ বছর বয়সী এক প্রতিবন্ধী কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ, ভয়ভীতি দেখিয়ে ধর্ষণের পর তাকে বিষয়টি গোপন রাখতে ১০০ টাকা দেওয়া হয়। পরে স্থানীয় সালিশে মীমাংসার চেষ্টা এবং ভুক্তভোগীর পরিবারকে ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর পঞ্চগড়ের হাফিজাবাদ ইউনিয়নের রাজমহল-পূর্ববাগান এলাকায় প্রেমের সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে রাজমিস্ত্রি শ্রমিক সোহেল ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, সোহেল ওই ছাত্রীকে একটি বাড়িতে নিয়ে গিয়ে সহযোগীদের সহায়তায় ধর্ষণ করেন। পরে ওই স্কুলছাত্রী বিষপান করে আত্মহত্যা করেন। গত ১৪ সেপ্টেম্বর জামালপুরের মাদারগঞ্জে সাত বছরের এক স্কুলছাত্রীকে স্কুল থেকে ডেকে নিয়ে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, জামিনুর নামে এক ব্যক্তি শিশুটিকে কৌশলে বাড়িতে নিয়ে ধর্ষণ করেন। পরে ওড়না দিয়ে পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করে মরদেহ ঘরের মেঝেতে খোঁড়া গর্তে পুঁতে রাখার অভিযোগ রয়েছে। গত ২ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে শ্বাসরোধ করে সামিহা হাকিম নিহা (১৯) নামে এক গৃহবধূকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। স্বজনদের দাবি, শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করেছে। গত ১৯ সেপ্টেম্বর ভোলার দৌলতখান উপজেলায় যৌতুক না পেয়ে আখি আক্তার (১৯) নামে এক গৃবধুর শরীরে এসিড দিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে তার স্বামী তার স্বামী হাসনাইন আহমেদ মুসার (২৫) বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীর অভিযোগ, বিয়ের পাঁচ মাস পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের নির্যাতনের করে আসছিলো। এমনকি ঘটনার দিন রাতে স্বামী বাজার থেকে এসিড এনে তাঁর শরীরে লাগিয়ে দেন এবং পরে তাকে ঘরে আটকে রাখেন।
মামলা ও গ্রেফতার
সেপ্টেম্বর মাসে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে সংঘটিত বিভিন্ন সহিংসতা ও রাজনৈতিক ঘটনায় কমপক্ষে ২৩ টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় ৫২৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও প্রায় ৬৮৭ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এছাড়া, একই মাসে রাজনৈতিক, যৌথ অভিযান ও বিশেষ অভিযানসহ মোট ২৮৭ টি ঘটনায় অন্তত ২১২০৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগের অন্তত ১৬৬৫ জন নেতাকর্মী, বিএনপির ৬২ জন, জামায়াতে ইসলামির ৩১ জন, এনসিপির ১ জন এবং উগ্রপন্থী সংগঠনের ২৪ জন সদস্য রয়েছে। এছাড়া, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, চাঁদপুর, লক্ষীপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর বয়সী অপরাধে সম্পৃক্ততায় ও সন্দেহভাজন হিসেবে এ মাসে ৩১৪৫ জনের অধিক কিশোরকে আটক ও জিম্মায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হয়েছে, যাদের মধ্যে আট শতাধিক কিশোরকে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পাশাপাশি, সন্ত্রাস, নাশকতা, পরোয়ানাভুক্ত আসামি গ্রেপ্তার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে নিয়মিত অভিযানও অব্যাহত ছিল। অপরদিকে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং সম্ভাব্য নাশকতা প্রতিরোধে সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়। এসব অভিযানে ১৬৩০৪ জনেরও বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গত আগস্টে ৬২টি মামলায় ১১২৫ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ২২০৯ জনকে অজ্ঞাত আসামী করা হয়। এছাড়া ১৬২ টি ঘটনায় ১২৮২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের অন্তত ৪২৯ জন নেতাকর্মী, বিএনপির ২২ জন, জামায়াতে ইসলামির ৪ জন, এনসিপির ৯ জন এবং উগ্রপন্থী সংগঠনের ৫ জন সদস্য ছিলেন।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৭টার দিকে কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার পাটিকাবাড়ি ইউনিয়নের নলকুলা গ্রামে নিজ বাড়ি থেকে নুর জাহান বেগম নামের ৬৫ বছরের বৃদ্ধ এক নারীকে গাড়িতে করে তুলে নিয়ে দুপুরে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে মামলা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় ও পরিবার সুত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন সাড়ে ৭টার দিকে দুটি গাড়িতে করে পুলিশের একটি দল আসে। বাড়ির ভেতর তিনজন নারী পুলিশ সদস্যসহ পুরুষ পুলিশ প্রবেশ করেন। তাঁরা নুর জাহান বেগমকে বলেন, “আপনি মামলার বাদী, ওসি স্যার কথা বলবেন, গাড়িতে ওঠেন।”এরপর তাঁকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। ভুক্তভোগীর মেয়ে সেলিনা আক্তারের অভিযোগ, সপ্তাহ দুয়েক আগে সামাজিক ও জমি-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে তাঁদের বাড়িতে ও গুদামে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করে এলাকার একদল লোক। পরে কৃষক দলের স্থানীয় কার্যালয় ভাঙচুর করে এলাকার আরও কয়েকজনের বাড়িঘরে হামলা ও লুটপাট চালানো হয়। এ ঘটনায় বিএনপির পাশাপাশি আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) কিছু লোক জড়িত। এ ঘঠনায় মা নুর জাহান বেগম বাদী হয়ে ২১ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়ার আদালতে একটি মামলা করেন। কিন্তু মামলায় সাথে কৃষকদল ও আওয়ামীলীগের ২২ জনের নাম উল্লেখ করে আরও ৩০জনকে অজ্ঞাত করে এ মামলা হয়। এর প্রেক্ষিতে মামলার সাথে যুক্ত স্থানীয় বিএনপি নেতারা মাকে মামলাটি তুলে নিতে চাপ দিচ্ছিলেন। এমনকি মামলাটি পিবিআই তদন্ত করছে বলে জানান তিনি।
দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি, যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দৃঢ় হয় এবং মানুষের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা, গণপিটুনী ও মব সহিংসতা, এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ-এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। তাই “এইচআরএসএস” সরকারের প্রতি মানবাধিকার রক্ষায় আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছে এবং একই সাথে সকল নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতি অধিক সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানাচ্ছে।
