Menu

News Details

Image

Human Rights Situation Report of Bangladesh (March 2026)

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি প্রতিবেদন (মার্চ-২০২৬)

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয় যেখানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে এবং গণভোটে হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়।  ১৭ ফেব্রুয়ারি জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার শপথ গ্রহণ করে দায়িত্ব গ্রহণ করে, যা দীর্ঘ দুই দশক পর বিএনপির শাসনক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন।  নতুন সরকার কিছু ভালো পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও রমজান মাসে নিত্যপন্য দ্রব্যের বাজারে অস্থিরতা, সারাদেশে  ঈদ যাত্রায় সাড়ে তিন শতাধিক মানুষের মৃত্যু, হামের প্রাদুর্ভাবে অর্ধশতাধিক শিশুর মৃত্যু এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে কমপক্ষে ৬ জন প্রবাসী বাংলাদেশীর মৃত্যু ও বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের বিষয়ে অস্থিরতায় জনমনে অস্বস্তি ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে যা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া অম্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারীকৃত ১৩৩ টি অধ্যাদেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অধ্যাদেশ সংসদে পাশ না করার সিদ্ধান্ত নতুন সরকারের ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার সমুন্নত রাখার প্রতিশ্রুতির বিষয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। গণভোট আদেশ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ও স্বতন্ত্র সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিল এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশকে যাচাই-বাছাইয়ের নামে স্থগিতের সুপারিশ হতাশাজনক।

মার্চ ২০২৬ মাসটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস-এর ঐতিহাসিক তাৎপর্যের মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত হলেও দেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক। সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা ও প্রতিহিংসামূলক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা এ মাসেও অব্যাহত ছিল। যার ফলে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে বহু মানুষ আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন । একই সঙ্গে দেশে সাংবাদিক নির্যাতন, নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, সংখ্যালঘু নির্যাতন, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ এর অপব্যবহার, গণপিটুনি ও কারাগারে মৃত্যু, আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্রিক সহিংসতার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়ে নাগরিক নিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে ।

মার্চ মাসে পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের ব্যাপক যাত্রাকে কেন্দ্র করে সড়ক ও নৌপথে একাধিক দুর্ঘটনায় সাড়ে তিন শতাধিক মানুষের মৃত্যু এবং বহু মানুষের আহত হওয়ার ঘটনা দেশের জননিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুতর সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। চলতি মাসে হামে আক্রান্ত হয়ে ৫৬ টি জেলায় অর্ধশতাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা ও টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতিকে সামনে নিয়ে এসেছে। এছাড়া, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের বৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে তাদের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিচ্ছে। মার্চ মাসে তেলপাম্পে তেল নেওয়াকে কেন্দ্র করে ৩ জনের প্রাণহানী ও বেশ কিছু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, যা গভীরভাবে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। এক্ষেত্রে বাজার তদারকির দুর্বলতা ও সরবরাহ ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

বাংলাদেশের ১৬ টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এর সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে নিন্মোক্ত তথ্য উঠে এসেছে।

রাজনৈতিক সহিংসতা

মার্চ মাসে কমপক্ষে ১১৩ টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১৮ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৯১২ জন। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা, প্রার্থীর সমর্থকের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা, বাড়ি-ঘর, যানবাহন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ও রাজনৈতিক দলের কার্যালয় ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট কেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। মার্চ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতা তুলনামূলক কমলেও নিহতের সংখ্যা ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় বেড়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ৩৪৬ টি “রাজনৈতিক সহিংসতার” ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন ১০ জন।

মার্চ মাসে সহিংসতার ১১৩টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ৪৫টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৫০১জন ও নিহত ০৯ জন। ১৬ টি বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১০৯ জন ও নিহত ০৫ জন, ২২ টি বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১৫৬ জন এবং নিহত হয়েছেন ২জন। ২ টি বিএনপি-এনসিপি মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ১১ জন, ২১ টি বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৩৯ জন । এছাড়া, বিভিন্ন দলের মধ্যে ৭ টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৯৬ জন ও নিহত হয়েছেন ২জন। নিহত ১৮ জনের মধ্যে বিএনপির ১৩ জন, জামায়াতের ০২ জন, পার্বত্য চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক রাজনৈতিক দলের ২ জন ও একজন সাধারণ মানুষ। রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ১৮ জনের মধ্যে একজন নারী, একজন কিশোর ও একজন সাধারণ মানুষ রয়েছেন।

এর পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ১৩ টি ঘটনা ঘটেছে। এসকল হামলায় কমপক্ষে ৮ জন আহত এবং আওয়ামীলীগের ১ জন, ও বিএনপির ৫ জনসহ মোট ৬ জন নিহত হয়েছেন। এ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় কমপক্ষে ১৫ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এছাড়াও সারাদেশে আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রীক অন্তত ২৮টি ঘটনায় কমপক্ষে ১৩০টি বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠা, দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। 

নির্বাচনী সহিংসতা

সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা ও প্রতিহিংসামূলক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় সারাদেশে অন্তত ৯টি সহিংসতার ঘটনায় কমপক্ষে ১০৯ আহত হয়েছেন এবং ৩জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ৬টি ঘটনায় ১০৬ জন আহত ও ২জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে ১ জন আহত ও ১জন নিহত এবং অন্যান্য দলের মধ্যে ২টি সংঘর্ষে ২জন আহত হয়েছে।

মার্চ মাসে নির্বাচনী সহিংসতায় ৩ জন নিহত হয়েছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায় নির্বাচনী বিরোধের জেরে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে দুজন নিহত এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় নীলগঞ্জ ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে মো. ইদ্রিস (৪৫) নামে এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে মারধর করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে।

সভা-সমাবেশে বাঁধা

এ মাসে মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার চর্চার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপের একাধিক ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উক্ত সময়ে অন্তত ৮টি সভা ও সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা প্রদান করে, যার ফলে নির্ধারিত কর্মসূচি স্থগিত, ছত্রভঙ্গ অথবা বাতিল করতে বাধ্য হন আয়োজকরা। এই ধরনের হস্তক্ষেপের ফলে সংঘর্ষ ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং অন্তত ৮১ জন ব্যক্তি আহত হন, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ পথচারীও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানি

এটি উদ্বেগজনক যে, এ মাসে অন্তত ৩৪ টি হামলার ঘটনায় কমপক্ষে ৫৯ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সকল ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্ততপক্ষে ৩৩ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ৩ জন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ১২ জন সাংবাদিক । এছাড়াও ১ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। এছাড়া সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ-২০২৫ এর অধীনে ৮জন সাংবাদিককে আসামী করে একটি মামলা হয়েছে।

মত প্রকাশের স্বাধীনতা

এ মাসে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫-এর বিভিন্ন ধারার অধীনে পৃথক ২টি মামলায় ৮জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। গত ২৮ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দেওয়ায় একজনকে আটক করা হয়েছে। গত ৩ মার্চ পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ফেসবুকে বিএনপি নেতা জহিরুল ইসলামের বিরূদ্ধে সমালোচনামূলক পোস্ট দেওয়ায় মো. ইদ্রিস (৪৫) নামে একজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া ২ জনকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও অবমাননার অভিযোগে মামলা দায়ের ও আটক করা হয়েছে।

মব সহিংসতা ও গণপিটুনী

এ মাসে গণপিটুনী ও মব সহিংসতার কমপক্ষে ২৫ টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১৩ জন এবং আহত হয়েছেন ৩৮ জন। গত ৪ মার্চ সাতঘরিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের বিদ্যুতের তার চুরি করে পালানোর সময় মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মো. সাগর (৩২) ও সানারুল (৩৪) নামের দুই যুবককে চুরির অভিযোগে গাছে বেঁধে রাত থেকে সকাল পর্যন্ত গাছের সঙ্গে বেঁধে দফায় দফায় পিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়।

ধর্মীয় ও সংখ্যালঘু নির্যাতন

এটি উদ্বেগজনক যে, এ মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর কমপক্ষে ১০ টি হামলার ঘটনায় ০৫ জন আহত হয়েছেন, এবং ৩ টি মন্দির, ১ টি প্রতিমা ও ৩ টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে । এছাড়াও জমি দখলের মত ১ টি ঘটনা ঘটেছে। গত ৮ মার্চ শনিপুজা চলাকালে কুমিল্লা নগরীর দক্ষিণ ঠাকুরপাড়া (বাগানবাড়ি) এলাকার কালী গাছতলা শিব মন্দিরসহ আশপাশের এলাকায় ককটেল বিষ্ফোরণে পুরোহিত কেশব চক্রবর্তীসহ ৪ জন আহত হন।

সীমান্তে হত্যা ও নির্যাতন

মার্চ মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ০৪ টি হামলার ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হামলায় আহত হয়েছেন ০৪ জন, যাদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত ৩ জন। এছাড়া একজনকে আটক করা হয়েছে।  অপরদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ৫টি সহিংসতার ঘটনায় ১জন আহত ও ২৭ জনকে আটক করা হয়েছে। গত ০৬ মার্চ বান্দরবানের সীমান্তবর্তী নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে পুতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে আবদুল জব্বার (৫৩) নামে এক ব্যক্তি গুরুতর আহত হন। বিস্ফোরণে তার একটি পা উড়ে যায়। 

 

 

কারা হেফাজতে মৃত্যু

এ মাসে সারাদেশে কারাগারে কমপক্ষে ১২ জন আসামী মারা গিয়েছেন । ১২ জনই কয়েদী। এর মধ্যে ২ জন আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের এবং ১০ জন্য সাধারণ কয়েদী মারা গেছেন। গত ১৫ মার্চ সকালে কারাবরণ অবস্থায় অসুস্থ অবস্থায় রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার হাটশেরপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শাহনূর আলম (৬০)। এর আগে তাকে গত ৩ জানুয়ারি বগুড়া থেকে মব করে পুলিশি হেফাজতে তুলে দেয় স্থানীয়রা।

বিচার বহির্ভূত হত্যা (অভিযানে/হেফাজতে/নির্যাতনে)

দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, ভিকটিমের পরিবার ও এইচআরএসএস এর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে পুলিশি অভিযানের সময়ে নির্যাতনে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ৫ মার্চ নওগাঁর মহাদেবপুরে অভিযান চলাকালে পুলিশের লাথির আঘাতে আব্দুল হামিদ ধলা (৬৬) নামে এক আসামির বাবার মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। নিহত আব্দুল হামিদের নাতি রিপন জানান, ‘তারা দাদা-নাতি এক ঘরে ঘুমিয়ে ছিলেন। মধ্যরাতে পাঁচজন পুলিশ এসে তার দাদাকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশ তার দাদাকে লাথি মারলে পুলিশের লাথিতে তার দাদা মাটিতে পড়ে যান। সেখানেই তিনি মারা যান।’

শ্রমিক নির্যাতন

মার্চ মাসে ৭৭ টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৯ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৭৬ জন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় ৩৮ জন শ্রমিক তাদের কর্মক্ষেত্রে মারা গেছেন। অন্যদিকে, উদ্বেগের বিষয় এই যে, গত ২৭ মার্চ লিবিয়া থেকে ইউরোপে যাবার পথে ভূমধ্যসাগরে গ্রিসের উপকূলে একটি রাবারের নৌকায় টানা ছয় দিন সমুদ্রে ভেসে থাকায় ১৮ জন বাংলাদেশী অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় বেঁচে ফেরা ২১ জন বাংলাদেশীকে গ্রীক কোস্টগার্ড জীবিত উদ্ধার করেছ। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যুদ্ধে বিভিন্ন দেশের অন্তত ৬ জন শ্রমিক নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।  গত ৮ মার্চ রাজধানীর বনানীতে একটি বহুতল ভবনের তিনতলা থেকে পড়ে পিংকী (১৫) নামে এক গৃহকর্মীর রহস্যজনক মৃত্যু হয়। অভিযোগ রয়েছে, তাকে নির্যাতনের পর ফেলে দেওয়া হয়েছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন

মার্চ মাসে কমপক্ষে ২৭৩ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অন্তত ৭২ জন, যাদের মধ্যে ৪১ (৫৭%) জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, ১৬ জন নারী ও কন্যা শিশু গণধর্ষনের শিকার হয়েছেন এবং ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়েছে ৫ জনকে যাদের মধ্যে  শিশু ৩ জন এবং ধর্ষিত হয়ে আত্মহত্যা করেছেন ১ জন। ৫৩ জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন তন্মধ্যে শিশু ২৩ জন। এছাড়া, যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত ৩ আহত হয়েছেন ৪ জন নারী। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৫১ জন, আহত হয়েছেন ৪৬ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ৪৩ জন নারী। গত ২ মার্চ চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে ইকোপার্কের নির্জন এলাকা থেকে জান্নাতুল নিশা ইরা (৭) নামে এক শিশুকে ধর্ষনের পর গলা কেটে হত্যার চেষ্টা করা হয়। ঘটনার পরের দিন  চিকিৎসাধীন অবস্থায়  শিশুটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করে। গত ১৪ মার্চ চুয়াডাঙ্গা দামুড়হুদায় দলিয়াপুর  জোবেদা খাতুন (৪৫) নামে এক বিধবা নারীকে গণধর্ষণের পর কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ৩০ মার্চ ময়মনসিংহের ফুলপুরে ধর্ষনের অভিযোগ ওঠার পর এক কিশোরীর (১৩) বিষপানে আত্নহত্যার ঘটনা ঘটেছে। ২২ মার্চ নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে যৌতুক না পেয়ে গৃহবধূ অনিকা খাতুন ওরফে ফারহানা (২৪) তার স্বামী মো: সাগর কতৃক নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়।

অন্যদিকে, এটি উদ্বেগজনক যে, ১৭৬ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যাদের মধ্যে ৬৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ১১২ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। চিকিৎসা অব্যবস্থাপনা, আইসিইউ সংকট, হামের উপসর্গে গত মাসে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে অন্তত ৫১ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

মামলা ও গ্রেফতার

এ মাসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মী এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ধারায় কমপক্ষে ২৮ টি মামলা হয়েছে। এ সকল মামলায় ৩০৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ১২৭ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামী করা হয়েছে। এ মাসে রাজনৈতিক মামলায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কমপক্ষে ২২৫ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যেখানে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মী অন্তত ১১০ জন,  বিএনপির নেতাকর্মী ৮৫ জন এবং জামায়াতের ২০ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এর ৮ জন। এছাড়া এই সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সারাদেশে যৌথবাহিনীর বিশেষ অভিযানে দেড় হাজারের অধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের পরিচয়ধারী ব্যক্তি।

সার্বিকভাবে মানবাধিকার পরিস্থিতি, ন্যায়বিচার, মানুষের সমান অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বাধীনভাবে বিচারক নিয়োগ, স্বাধীন বিচার সচিবালয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই গণভোট আদেশ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, স্বতন্ত্র সচিবালয় অধ্যাদেশ, দুদক নিয়োগ অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশসহ অম্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারীকৃত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশসমূহ চলতি জাতীয় সংসদ অধিবেশনে পাশ করা জরুরী ।

একইসাথে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি, যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দৃঢ় হয় এবং মানুষের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচনী সহিংসতা, মব সহিংসতা, রাজনৈতিক উত্তেজনা, এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ-এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। তাই “এইচআরএসএস” সরকারের প্রতি মানবাধিকার রক্ষায় আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছে এবং একই সাথে সকল নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ  ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতি অধিক সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানাচ্ছে।

ধন্যবাদসহ

ইজাজুল ইসলাম

নির্বাহী পরিচালক

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)