Menu

News Details

Image

মোংলার নিখোঁজ জেলে মিরাজ শেখের সন্ধান দাবিতে সংবাদ সম্মেলন

মোংলার নিখোঁজ জেলে মিরাজ শেখের সন্ধান দাবিতে সংবাদ সম্মেলন

স্থান- জাতীয় প্রেস ক্লাব; তারিখ- ২৪ আগষ্ট ২০২৬

আজ আমরা গভীর উদ্বেগ ও যন্ত্রণা নিয়ে আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি বাগেরহাট জেলার মোংলা উপজেলার জয়মনি এলাকার বাসিন্দা মিরাজ শেখের সন্ধান দাবিতে। মিরাজ শেখ পেশায় মোটরসাইকেল ভাড়া চালক ও জেলে। গত ১০ এপ্রিল, শুক্রবার সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে জয়মনি ঠোটার আল আমিনের চায়ের দোকান থেকে দুই জন সাদা পোশাকধারী কোস্ট গার্ড সদস্য তাকে ১০০-১৫০ গজ দূরে অবস্থিত কোস্ট গার্ডের পল্টুনে (হারবাড়িয়া কোস্ট গার্ড স্টেশন) মান্নান এর জালি বোটে তুলে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে কিছু সময়ের মধ্যে মোংলা দিক থেকে একটি কোস্ট গার্ড স্পিড বোট আসে, যেখানে ৭-৮ জন ইউনিফর্ম পরিহিত সদস্য ছিলেন। তারা পল্টনে উঠে মিরাজ শেখের সাথে ছবি ও ভিডিও ধারণ করে এবং পরবর্তীতে তাকে তাদের সঙ্গে বোটে নিয়ে চলে যায়। ঘটনাটি উপস্থিত গ্রামবাসীসহ মিরাজের স্ত্রীর সামনেই ঘটে। মিরাজ শেখের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি কোস্ট গার্ড সদস্যরা দোকানদার আল আমিনের জিম্মায় রেখে যায়, তবে চাবি মিরাজের কাছেই ছিল।

প্রায় ১১ দিন পর গভীর রাতে মিজান মাঝিসহ ২ জন কোস্ট গার্ড সদস্য পল্টুন থেকে বের হয়ে এসে মোটরসাইকেলটি নিয়ে যায়। তাদের একজনের নাম রবিন বলে জানা যায় এবং অন্যজন মুখে কালো মাস্ক পরিহিত ছিল। ঘটনার পরিবারের পক্ষ থেকে স্থানীয় থানাসহ বিভিন্ন স্থানে যোগাযোগ করা হয় এবং ২৩ এপ্রিল মোংলা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নাম্বার-১১৮৪) করা হয় । ১০, ১১ ও ১২ এপ্রিল পল্টুন কোস্ট গার্ডের একজন সদস্যের (সিসি) সাথে পরিবারের সদস্যদের একাধিকবার কথা হয়  এবং তিনি স্বীকার করেন যে মিরাজ তাদের হেফাজতে আছে। তিনি আশ্বাস দেন যে ২-৩ দিনের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে অথবা তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হবে। ১১ এপ্রিল সকাল ১০টায় মিরাজের স্ত্রী দিগরাজ কোস্ট গার্ড বেইজে গেলে ‍উকাসিং নামে একজন কোস্ট গার্ড সদস্য  জানায় যে আসামিকে নিয়ে অপারেশনে যাওয়া হবে এবং বিকাল ৪ টায় আসলে দেখা করতে দেওয়া হবে এবং তখনই ভেতর থেকে অন্য একজন কোস্ট গার্ড সদস্য বলে মিরাজকে কিছু খেতে দাসে না খেয়ে আছে কাল থেকে, এখনই ওকে নিয়ে অপারেশনে যাবো। কিন্তু পরবর্তীতে বিকাল ৪ টায় গেলে শাহীন নামে একজন কোস্ট গার্ড সদস্য আটকের ব্যাপারটি সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার অস্বীকার করে।

এই দীর্ঘ প্রায় সাড়ে চার মাসে পরিবার মোংলা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছে, বারবার কোস্টগার্ড কার্যালয়ে গিয়েছেন, প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছে এবং সুপ্রিম কোর্টে রিট আবেদন করেছেন। ফলস্বরূপ হাইকোর্ট গত ১২ জুলাই ২০২৬ তারিখে কোস্টগার্ডকে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে নিখোঁজ মিরাজ শেখকে খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন। অথচ কোস্টগার্ড কর্তৃপক্ষ ঘটনার প্রথম ২-৩ দিন আটকের বিষয়টি স্বীকার করলেও পরে বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে এবং এখনো পর্যন্ত মিরাজের কোনো হদিস মেলেনি।

এদিকে সন্ধানের দাবিতে আয়োজিত একটি শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে, ব্যানার-ফেস্টুন কেড়ে নেওয়া হয়েছে এবং সন্ত্রাস বিরোধী আইনে ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে।। পরবর্তীতে মিরাজকে ফেরত ও সিসিটিভি ফুটেজ যাচাইয়ের দাবিতে পরিবার ও গ্রামবাসী পন্টুনে গেলে কোস্টগার্ড তাদের ওপর লাঠিচার্জ চালায়, যার ফলে সৃষ্ট উত্তেজনায় বেশ কিছু গ্রামবাসী আহত হন এবং মিরাজের মা, বোন ও স্ত্রীকেও আটক করা হয়। এই ঘটনায় মিরাজের পরিবারসহ ৪৪ জনের নামসহ ও অজ্ঞাত ৩০০ জনের নামে মামলা দেওয়া হয়েছে।

আমাদের সংগৃহীত তথ্যমতে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এই ঘটনাটি বাংলাদেশে সংঘটিত প্রথম গুমের ঘটনা যেখানে কোস্টগার্ড কর্তৃক মিরাজ শেখকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সর্বশেষ কোস্টগার্ডের হেফাজতেই দেখা গিয়েছিল।

আমরা তাই রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোরালো আবেদন জানাচ্ছি—

  • অবিলম্বে হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী মিরাজ শেখকে জীবিত ও সুস্থ অবস্থায় খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করতে হবে
  • দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, মিরাজ শেখকে সূনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট থানার মাধ্যমে এখতিয়ার সম্পন্ন আদালতে প্রেরণের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা করা হয়নি, এরূপ আইনগত প্রক্রিয়া প্রতিপালনে ব্যর্থতার জন্য সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
  • যদি মিরাজ শেখের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থেকে থাকে, তবে তাকে দেশের প্রচলিত আইনে, প্রকাশ্য বিচার প্রক্রিয়ায় আদালতে সোপর্দ করতেবে — বিনা বিচারে আটক বা নির্যাতনের অধিকার কারও নেই।
  • এই ঘটনায় জড়িত কোস্ট গার্ডের সংশ্লিষ্ট সকল সদস্যের বিরুদ্ধে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতেবে
  • ভুক্তভোগী পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেবে, যাতে তারা কোনো হুমকি বা হয়রানির শিকার না হ
  • কোন ব্যক্তিকে আটক করার ক্ষেত্রে ফৌজদারী কার্যবিধির বিধান অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তার পরিচয় প্রকাশ করে আটকের কারণ উল্লেখসহ আটককৃত ব্যক্তির পরিবার বা আত্নীয়কে জানাতে হবে- এ বিষয়ে আইন প্রয়োগকারী সদস্যদেরকে পর্যাপ্ত সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
  • গুম প্রতিরোধে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে আরও শক্তিশালী করা এবং স্বাধীনভাবে তদন্তের ক্ষমতা প্রদান করতে হবে।

একটি সাত বছরের শিশু তার বাবার পথ চেয়ে বসে আছে। একটি পরিবার প্রতিটি মুহূর্ত দুশ্চিন্তায় কাটাচ্ছে তাদের প্রিয়জনের জীবিত ফিরে আসার আশায়। আমরা আশা করি, রাষ্ট্র, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে এই মানবিক আবেদনে সাড়া দেবে এবং মিরাজ শেখকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেবে।

 

ধন্যবাদসহ

ইজাজুল ইসলাম

নির্বাহী পরিচালক

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)

ইমেইল: [email protected]